জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিকঃ আমার কোন জাতি নেই, আমার কোন ধর্ম নেই, আমার কোন ঈশ্বর নেই, আমি স্বাধীন, আমি কাঞ্চনজঙ্ঘা – এটা কার কথা জানেন। আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রেন্ডলি হন, আমি নিশ্চিত তাহলে আপনি এই উক্তির সঙ্গে ইতিমধ্যে পরিচিত। ঠিকই ধরেছেন জুবিন গর্গের কথা বলছি। ১৯ সেপ্টেম্বর যিনি পঞ্চভূতে বিলিন হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে থমকে যায় অসম। কিন্তু তাঁকে নিয়ে অসমীয়াদের আবেগে এতটুকু ভাঁটা পড়েনি। চিরজীবন অসমীয়াদের মননে থেকে যাবেন গায়ক। শুক্রবার সিঙ্গাপুরে জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছে অসমের কালচারাল আইকনের। ২০ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে তাঁর মরদেহ পৌঁছায় দিল্লিতে। একসঙ্গে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ সেই ফ্লাইট ফলো করছিল অনলাইনে। যা ঐতিহাসিক। ভাবতে পারছেন। পঞ্চভূতে বিলিন হয়েও অসমীয়াদের মননে গায়ক। রবিবার সকালে অসমের গুয়াহাটি বিমানবন্দরে জুবিনের মরদেহ পৌঁছানো মাত্রই ছুটে আসতে দেখা যায় বিমানবন্দরের কর্মীরা। কফিন ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। বিমানবন্দর থেকে গায়কের বাড়ি যাওয়ার ৩০ কিলোমিটারের রাস্তা যেতে সময় লাগে ৭ ঘণ্টা।

গায়কের দেহ অসমে ফেরার পর থেকে অনুরাগীরা একবারের জন্যও তাঁর সঙ্গ ছাড়েননি। জুবিনের মুখাগ্নি করেন তাঁর বোন পামি বরঠাকুর ৷ সঙ্গে ছিলেন জুবিন ঘনিষ্ঠ অরুণ গর্গ এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী রাহুল গৌতম শর্মা। স্টেডিয়াম থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কামারকুচি এনসি গ্রামে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জুবিনের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয় ৷ উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল লক্ষ্মণ প্রসাদ আচার্য, সংগীতশিল্পী পাপন এবং ভুটানের রাজার এক প্রতিনিধি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ভিড় জমান লক্ষাধিক অনুরাগী। অসমের ঐতিহ্যবাহী গামোছা দিয়ে ঢেকে লাল চন্দন কাঠে সাজানো চিতায় তোলা হয় গায়কের দেহ ৷ পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণে চোখের জলে জুবিনকে শেষ বিদায় জানায় অসম ৷
২৩ সেপ্টেম্বর জুবিনের শেষকৃত্যের জন্য গুয়াহাটির জাতীয় সড়কেও যান চলাচল বন্ধ ছিল। গায়কের শেষকৃত্যে জনসমুদ্রই বিশ্বের সর্ববৃহৎ চতুর্থ জমায়েত হিসেবে নাম লেখাল ‘লিমকা বুক অফ রেকর্ডে’। প্রিয় তারকাকে শেষবার দেখতে অসমের পথে নেমেছিল লাখ লাখ মানুষ। এবং অসম সরকারের হিসাব অনুযায়ী, জুবিনের শেষকৃত্যে ১৭ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। ভারতের বুকে এর আগে কোনও তারকার জন্য এমন বিপুলসংখ্যায় মানুষ নেমেছে বলে অনন্ত তেমন নজির নেই। তবে পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের শেষযাত্রায় প্রায় ৫০ লাখের কাছাকাছি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। শোকে বিহ্বল হয়েছিলেন তাঁরা। ২০০৯ সালের ২৫শে জুন ৫০ বছর বয়সে মৃত্যু হয় আমেরিকান গায়ক মাইকেল জ্যাকসনের। পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুতেও জনজোয়ার দেখা গিয়েছিল। পোপ ফ্রান্সিস ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে ৮৮ বছর বয়সে মারা যান। ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে বাড়ি যান ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ দ্বিতীয়। তাঁর মৃত্যুর খবরে যে পরিমান লোক রাস্তায় নেমেছিলেন সেটা এখনও পর্যন্ত শেষকৃত্যে উপস্থিত জনসমাগমের নিরিখে দ্বিতীয়। চতুর্থ নম্বরে ভারতের জ়ুবিন গর্গ। আগেই জানিয়েছি, জুবিন গর্গের শেষকৃত্যে ১৭ লক্ষ লোক রাস্তায় নেমেছিলেন।

১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মহানায়ক উত্তমকুমারের মৃত্যুর খবরেও জনজোয়ার দেখা গিয়েছিল কলকাতার রাজপথে। ১৯৪১ সালের ৭ অগাস্ট বিশ্বকবির মৃত্যুতেও জনসমুদ্র দেখেছিল ভারতবাসী। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গিয়েছেন অসম কিং জুবিন গর্গ। শেষ যাত্রায় জনসমুদ্র দেখে অসমের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মানবিকতার সমুদ্র। প্রিয় ভূমিপুত্রকে বিদায় জানাতে সবাই এক হয়েছেন। তিনি রাজার মতো বেঁচেছেন। তাই ওঁকে রাজার মতোই স্বর্গে পাঠানো হচ্ছে।

২৩ সেপ্টেম্বর ময়নাতদন্তের পর নির্ধারিত সময়ে কামারকুচি এনসি গ্রামে জুবিনের শেষকৃত্য শুরু হয়। একুশ তোপে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিদায় জানানো হয় গায়ককে। শেষকৃত্যের সময় বাজানো হয় ‘মায়াবিনি’ গানটি। একটা কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি, বছর দুয়েক আগে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন জুবিন। তিনি বলেছিলেন- আমি মরলে গোটা অসমজুড়ে এই গানই বাজবে। সেটাই যেন কামারকুচির শেষকৃত্যে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হল। কামারকুচির শেষকৃত্যস্থলে জুবিন গর্গের স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য ১০ বিঘা জমি নেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে।
এরই মাঝে ভাইরাল হয় জুবিন গর্গের আগের একটি ভিডিয়ো। যেখানে গায়ককে বলতে শোনা যায়, আমি মারা গেলে ৭দিন স্তব্ধ থাকবে অসম। বুঝতে পারছেন নিজের জন্মভূমির প্রতি, সেখানকার মানুষের প্রতি ঠিক কতটা আস্থা থাকলে জোর দিয়ে এত বড় কথা বলা যায়। জুবিনের সেই কথাই বাস্তবে পরিনত হয়েছে। সমাজ মাধ্যমে জুবিন ভক্তরা লিখছেন। তাঁরা কেউ সমাজ মাধ্যম বন্ধ করে রেখেছেন। আবার কেউ লিখেছেন প্রিয় গায়কের মৃত্যুর খবরে তাঁদের বাড়িতে রান্নাই হয়নি।
ড. ভূপেন হাজারিকার পর অসমের সংস্কৃতিকে যিনি নতুন দিশা দেখিয়েছেন, তিনি জুবিন গর্গ। ভক্তদের কাছে তিনি কেবল গায়ক নন, আবেগ এবং যুগের প্রতীক। হাজারো বিতর্ক থাকলেও তাঁর কণ্ঠের মায়া, সৃষ্টিশীলতা ও মানবিকতার জন্য তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গীত-আকাশে চিরউজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন সবসময়।