প্রিয় গায়ককে শেষবার দেখতে উপচে পড়ল ভিড়।
সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক: শেষবারের মত দেখা দিলেন জুবিন গর্গ। তাঁকে দেখতে ভোর থেকে ভিড় আসামে। প্রিয় গায়ক, প্রিয় মানুষকে একবার দেখার জন্য রীতিমত স্তব্ধ আসাম। একদিকে তাকে দেখার আনন্দ, অন্যদিকে চিরবিচ্ছেদের কষ্ট। না থেকেও কি তীব্র ভাবে রয়েই গেলেন জুবিন।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর আচমকাই দাবানলের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই তীব্র মন খারাপের খবর, জুবিন গর্গ আর নেই, সিঙ্গাপুরে গান গাইতে গিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন তিনি, আসাম কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, যদিও শুধু আসাম না, ভারত তথা বিশ্বের সমস্ত প্রান্তে গান ভালোবাসা জুবিনকে ভালোবাসা মানুষ আত্মীয়বিয়োগের যন্ত্রণা পেয়েছিলেন যে আঘাত মিলিয়ে যাওয়ার নয়, গোটা আসামের প্রাণ ছিলেন জুবিন, শুধু গায়ক নয় মানু্ষ হিসাবে ভরসা হিসাবে সমস্ত আসামবাসীর ঘরের ছেলে ছিলেন তিনি, তার শেষ যাত্রার দিন আসাম অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। রান্না হয়নি কোন বাড়িতে স্কুল কলেজ অফিস ফাঁকা সবাই সেদিন জুবিনের সঙ্গী হয়েছিলেন, তার এই আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে কম জলঘোলা হয়নি নিছকই দুর্ঘটনা নাকি খুন হয়েছেন একাধিক কথা সমানে চলছে। এবার তাকে আরও একবার এবং শেষবার দেখতে আরও একবার স্তব্ধ হল আসাম।
গোটা আসামে জুবিন ছিলেন ঈশ্বরসম, যীশু তার প্রইয়াণের পর যেমন তার ভক্তদের জন্য ফিরে এসেছিলেন তেমন ভাবেই যেন ফিরলেন জুবিন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে জুবিন একটি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘এই গল্পটি ১৯ বছর ধরে আমার বুকে রয়েছে।’ ১৯ বছরের লালনপাল করা গল্পটিই যে তাঁর জীবনের শেষ গল্প হতে চলেছে, কে জানত! মুক্তি পেল জুবিন অভিনীত শেষ ছবি রৈ রৈ বিনালে। আর শেষবার তাকে দেখার জন্য ভোর থেকেই যে ভিড় জমবে সিনেমা হলগুলিতে তা তো বলাই বাহুল্য। একদিকে আসাম এর পাশাপাশি একই সময়ে বিদেশে মুক্তি পেয়েছে রই রই বিনালে। ইতিমধ্যেই আসামে সব সিনেমাহল হাউসফুল। টিকিট পাওয়াই যাচ্ছে না। এমনকী দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ থাকা অসমের দুটি সিনেমাহলও খুলতে হল। গৌহাটিতে প্রথম দিনে ১৭৯টি শোই হাউসফুল। চিরাংয়ের ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে রোজ ১৮টি শো হবে, যা অসমীয়া ছবির কয়েক দশকের ইতিহাসে একেবারে বেনজির। গোটা আসামের সবাই না দেখা পর্যন্ত ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আসলে এই ছবিটি এখন আর কেবল অসমীয়াদের জন্য নয়। যারা জুবিন গর্গকে ভালোবাসেন তাদের সকলেরই এই ছবিটি দেখা উচিত। দেশের ৪৬টি শহরে মুক্তি পাচ্ছে জুবিন গর্গ অভিনীত অন্তিম সিনেমা এমনকী বাদ যায়নি কলকাতাও, কলকাতার বেশ কিছু মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পেয়েছে অসমীয়া ভগবানের এই শেষ সিনেমা , সাউথ সিটির মতো জায়গায় দুটো করে শো রয়েছে। আসামে ভোর থেকেই মানুষ সিনেমা হল মুখী হচ্ছেন এই সিনেমা যে থেকে আসাম যা জিএসটি পাবে তা তুলে দেওয়া হবে জুবিন ফাউন্ডেশনের হাতে।
একদিকে যখন শুরু থেকেই ঝড় তুলছে রই রই বিনালে ঠিক সেই আবহেই তুমুল ভাইরাল অনুরাগীদের উদ্দেশে নিজের হাতে লেখা প্রয়াত গায়ক জুবিনের শেষ চিঠি। পোস্টারকার্ডে জ্বলজ্বল করছে প্রয়াত গায়কের সিনেমার চরিত্র আর তাঁর হাতের লেখা। যেখানে অনুরাগীদের উদ্দেশে জুবিন লিখেছেন, “একটু অপেক্ষা করুন। আমার নতুন সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। তোমরা এসে যাবে কিন্তু। ভালোবাসা নিও। – ইতি তোমাদের জুবিনদা।” আর সেই আমন্ত্রণপত্র বুকে আঁকড়েই ‘রই রই বিনালে’র টিকিট বুকিংয়ে ঝড় তুলেছে অসমবাসী। জানা গিয়েছে, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে পরিচালক রাজেশ ভুঁইয়ার সঙ্গে বসে এই সিনেমার প্রোমশনের পরিকল্পনা করেছিলেন খোদ জুবিন।এই সিনেমায় অন্ধ গায়কের ভূমিকায় দেখা যাবে তাকে, শুধু যে অভিনয়ই করেছেন তিনি তা কিন্তু নয়, প্রযোজনাও করেছেন জুবিনই। জুবিনের শেষ সিনেমা মুক্তির আগে অসমীয়া যুব মঞ্চ গুয়াহাটির নারেঙ্গী গোল্ড সিনেমা হলের সামনে জুবিনের ছবিতে দুধ ঢেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।আবার প্রথম দিনের প্রথম শো উপলক্ষে ভঙাগড়ের রুদ্রাক্ষ মলে অবস্থিত এনওয়াই সিনেমা হলে সকাল সাড়ে আটটায় গুয়াহাটির বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রী, অনাথ আশ্রমের শিশু এবং বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণ নাগরিক-সহ মোট ২১৬ জনকে বিনামূল্যে সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। জুবিন গর্গের মৃত্যুর পর থেকে গোটা অসম এখন যেন এক আবেগময় অভিযাত্রায় অংশ নিচ্ছে। ভক্তদের চোখে ‘রই রই বিনালে’ কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি এক যুগের সমাপ্তি ও এক কিংবদন্তির অমর স্মৃতি। তারই ইচ্ছে ছিল ৩১ তারিখ এই সিনেমা রিলিজ করবে এবং তার ইচ্ছে মতই সব হচ্ছে, তার স্ত্রী গরিমা গোটা বিষয়টার দিকে নজর রাখছেন, শুধু মানুষটা আর আজ সশরীরে আমাদের মধ্যে নেই। তবে শেষবার জুবিনের সঙ্গে দেখা হবে আমাদের, আরও একবার চোখ ভিজবে আরও একবার মন কাড়বেন জুবিন।