ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দূরত্ব ?

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক ক্ষমতা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ শক্তিকে দুর্বল করতে চাইছে। ইজরায়েলের লক্ষ্য ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে জমেছে অশান্তির কলো মেঘ। আগুনে ঘি ঢালার মতো একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলা। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ইরান,ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জটিল ত্রিভুজ সম্পর্ক। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ইরানের সাউথ পার্সে ইজরায়েলি হামলার পর পরিস্থিতি যে মাত্রায় উত্তপ্ত হয়েছে তা শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিকেই নয়, নাড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বের জ্বালানি বাজারকেও। এরই মধ্যে নিজের স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণ ও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ঘটনার শুরু ইজরায়েলের আকস্মিক হামলা দিয়ে যার লক্ষ্য ছিল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র। যা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ যা কাতারের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত। এই হামলার পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ইরান কাতারের একটি জ্বালানি স্থাপনায় আঘাত হানে। ফলে সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে এবং প্রশ্ন ওঠে এই যুদ্ধ কি কেবল ইরান-ইজরায়েল দ্বন্দ্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা ছড়িয়ে পড়বে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে?

এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার বিষয়ে কিছুই জানত না। এমনকি কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, হামলার আগে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় ছিল এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে সত্যিই কি যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা থেকে দূরে ছিল নাকি এটি কূটনৈতিক অবস্থান রক্ষার একটি কৌশল? ট্রাম্পের ভাষা বিশ্লেষণ করলেও একটি সূক্ষ্ম দূরত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তিনি ইজরায়েলের হামলাকে ক্রোধ ও হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া বলে উল্লেখ করেছেন যে শব্দচয়ন সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র তার শক্রদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করে। এতে অনেক বিশ্লেষকের মনে হয়েছে, ওয়াশিংটন হয়তো ইজরায়েলের কিছু পদক্ষেপে অস্বস্তি বোধ করছে। বিশেষ করে যখন ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেন, ইরান আর কাতারের বিরুদ্ধে কোনো বোকামি না করলে ইজরায়েলও আর গ্যাস ফিল্ডে হামলা করবে না। তখন তা একধরনের পরোক্ষ সতর্কবার্তা হিসেবেই ধরা পড়েছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন যে, ইজরায়েল এই অভিযানে একাই কাজ করেছে ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সমম্বয় অটুট। তিনি ট্রাম্পকে প্রধান নেতা হিসেবে তুলে ধরে দুই দেশের ঐক্যকে জোরালোভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ঐক্যের আড়ালে কৌশলগত পার্থক্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ইরানের সামরিক ক্ষমতা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ শক্তিকে দুর্বল করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে সেখানে ইজরায়েলের লক্ষ্য আরও গভীর। তারা সরাসরি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে দিতে চায়। এই পার্থক্যই মূলত দুই দেশের মধ্যে সূক্ষ্ম দূরত্ব তৈরি করছে। তবে এখানে বলাই যায়, যুদ্ধ থামানোর সময় নির্ধারণ ছাড়া বাকি সব বিষয়ে মিল থাকলেও শেষ লক্ষ্য নিয়ে দুই দেশের ভাবনায় ফারাক রয়েছে। একদিকে ট্রাম্পের আরেকটি মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও বিতর্কিত করেছে। তিনি হুমকি দিয়েছেন ইরান যদি আবার কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায় তবে যুক্তরাষ্ট্র ইজরায়েলের সাহায্য বা সম্মতি নিয়ে অথবা ছাড়াই সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডকে ধ্বংস করে দেবে। এই বক্তব্য যেমন ইরানের প্রতি কঠোর বার্তা রয়েছে, তেমনই ইজরায়েলের প্রতি একধরনের চাপ বা সতর্কতার ইঙ্গিতও লুকিয়ে আছে। অনেকেই এটিকে ট্রাম্পের অজান্তে বেরিয়ে আসা এক বাস্তব সত্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন যেখানে বন্ধুত্বের মাঝেও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি বড় হয়ে উঠছে। এই সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই বিশ্বের জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমতে শুরু করেছে যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে বলাই যায় ইরান-ইজরায়েল সংঘাত এখন আর শুধু একটি সামরিক লড়াই নয়। এটি হয়ে উঠেছে অন্য কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল এখনও বন্ধু কিন্তু সেই বন্ধুত্বের ভিতরে যে ফাটল তৈরি হচ্ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায় এই যুদ্ধ কি তাদের আরও কাছাকাছি আনবে নাকি ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেবে? হয়তো উত্তরটা এখনই স্পষ্ট নয়। তবে প্রতিটি বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিটি কূটনৈতিক বিবৃতি যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে এই সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। আমেরিকা ও ইজরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে আপনাদের কি মতামত তা কমেন্ট বক্সে জানান।