যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটলে হিমালয়ের পাদদেশের দেশগুলিতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : হিমালয়ের বুকে ২১০ টি জল বোমা রয়েছে যা যেকোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটলে হিমালয়ের পাদদেশের যে সমস্ত দেশগুলি রয়েছে সেগুলি বড় বিপর্যয় দেখা দেবে ।হিমালয় অঞ্চলে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গঠিত হিমবাহ হ্রদগুলিই (Glacial Lakes) বর্তমানে “জল বোমা” বা “Water Bombs” নামে পরিচিত। পরিবেশবিজ্ঞানী ও ভূতাত্ত্বিকদের গবেষণা অনুযায়ী, পুরো হিন্দু কুশ হিমালয় অঞ্চলে হাজার হাজার হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২০০-র বেশি (বিশেষ করে সংবেদনশীল অন্তত ২০০-২১০টি) অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং যেকোনো মুহূর্তে ফেটে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।১. “জল বোমা” বা GLOF কী?হিমালয়ের হিমবাহগুলি (Glaciers) বিশ্ব উষ্ণায়নের দরুন দ্রুত গলছে। গলে যাওয়া জল পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিক মাটি ও পাথরের বাঁধে (Moraine) জমা হয়ে বড় বড় হ্রদ তৈরি করে।বিস্ফোরণের কারণ: এই বাঁধগুলি কৃত্রিম বা সিমেন্টের নয়, এগুলো তৈরি মূলত আলগা পাথর, বরফ ও মাটি দিয়ে। ভূমিকম্প, ধস বা অতিরিক্ত বৃষ্টির দরুন এই ভঙ্গুর বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি লিটার জল ও কাদা হু হু করে নিচে নেমে আসে।পরিভাষায়: বৈজ্ঞানিক ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় GLOF বা Glacial Lake Outburst Flood (হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা)।২. কেন এটি দ্রুত ঘনিয়ে আসছে?কারণবিবরণদ্রুত হিমবাহ গলনবৈশ্বিক গড় উষ্ণতার চেয়ে হিমালয় অঞ্চলে উষ্ণায়ন প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত ঘটছে।হ্রদের আয়তন বৃদ্ধিগত কয়েক দশকে ছোট ছোট হিমবাহ হ্রদের আকার কয়েক গুণ বেড়ে বিশালাকার ধারণ করেছে।ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিহিমালয় অঞ্চল একটি সক্রিয় টেকটোনিক জোনে অবস্থিত। ছোট-বড় ভূমিকম্পের ধাক্কায় বাঁধের প্রাকৃতিক দেয়াল সহজেই ধসে যেতে পারে।৩. বিপজ্জনক অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানহিমালয় পর্বতমালার বিস্তৃত অংশে অবস্থিত প্রধানত তিনটি দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে:ভারত: সিকিম, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ এবং লাদাখ অঞ্চল। (যেমন: ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদ ফেটে মারাত্মক ধ্বংসলীলা ঘটেছিল)।নেপাল: নেপালে প্রায় ২,০০০-এর বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ (যেমন: চো রোলপা, ইমজা হ্রদ)।ভুটান: ভুটানে ২১টিরও বেশি হিমবাহ হ্রদ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা যেকোনো মুহূর্তে ফেটে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে।চীন (তিব্বত): তিব্বত মালভূমিতে প্রচুর জল সংগৃহীত রয়েছে, যা সীমান্ত পেরিয়ে নিচের দেশগুলোতেও প্রভাব ফেলে।৪. পাদদেশের দেশগুলোতে সম্ভাব্য বিপদের ভয়াবহতাযদি এই ২০০-২১০টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের মধ্যে একাধিক প্রধান হ্রদে বিস্ফোরণ ঘটে, তবে প্রভাব কেবল পাহাড়ি অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার পাদদেশের বিশাল সমতল ভূমিতে নেমে আসবে।১. জনজীবনের ক্ষয়ক্ষতি: হিমালয় সংলগ্ন অববাহিকায় বসবাসকারী প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ ঝুঁকির মুখে পড়বে।২. নদী অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা: গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু ও তিস্তা নদীর জলস্তর একলপ্তে চরম বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিশাল সমতল অঞ্চল প্লাবিত করবে।৩. পরিকাঠামো ধ্বংস: জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বাঁধ, সেতু, জাতীয় সড়ক ও জলবায়ু-বান্ধব বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।৪. কৃষি ও পরিবেশগত আঘাত: হ্রদের জলের সাথে নেমে আসা টন টন কাদা, পাথর ও পলি কৃষি জমিকে অকেজো করে দেবে এবং সুপেয় জলের উৎস ধ্বংস করবে।৫. প্রতিকার ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপজলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই জল বোমার প্রভাব কমাতে কতগুলি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শ দেন:আামাত চিহ্নিতকরণ ও সায়phon পদ্ধতি: সাইফন পাইপ বা পাম্পের সাহায্যে বিপজ্জনক হ্রদগুলি থেকে কৃত্রিমভাবে জল কমিয়ে চাপ কমানো।আামাত প্রারম্ভিক সতর্কতা ব্যবস্থা হ্রদে সেন্সর ও স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং বসিয়ে জলের স্তরে হঠাৎ পরিবর্তন হলে নিম্নাঞ্চলের মানুষকে আগাম সতর্ক করা।আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের মধ্যে আবহাওয়া ও হিমবাহ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের জন্য যৌথ উদ্যোগ গড়ে তোলা।