তিন অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনাস্থলে SIT, কড়া নিরাপত্তায় CID.

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার সূর্যপুরে নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুনের বহুচর্চিত মামলার তদন্তে ফের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল তদন্তকারী সংস্থা। বুধবার সকালে গ্রেফতার তিন অভিযুক্ত—আনন্দ সরদার, দিবাকর মণ্ডল এবং কবীর মোল্লাকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT)। মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র খুঁজে বের করা এবং অভিযুক্তদের বয়ানের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখতেই এদিন ফের ঘটনার পুনর্নির্মাণ বা ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে সিআইডির ফরেনসিক দলও।
তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্তদের দিয়ে ঘটনার প্রতিটি ধাপ দেখানো হবে। কোথা থেকে নাবালিকাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছিল, এরপর কীভাবে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ছেড়ে পালায়—সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, আদালতে চার্জশিটকে আরও শক্তিশালী করতে এবং ঘটনাক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতেই এই পুনর্নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিন সকাল থেকেই সূর্যপুর এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বারুইপুর পুলিশ জেলার পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ব়্যাফ0, সশস্ত্র পুলিশ এবং সাদা পোশাকের পুলিশকর্মীরাও এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছেন। সাধারণ মানুষের প্রবেশও নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে যাতে তদন্তে কোনও বিঘ্ন না ঘটে।
জানা গিয়েছে, রেলগেট থেকে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিটার হেঁটে অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের ঘিরে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছিল। উপস্থিত ছিলেন বারুইপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার-সহ একাধিক উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক। পাশাপাশি তদন্তে সহায়তার জন্য ঘটনাস্থলে পৌঁছান সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও। তাঁরা বিভিন্ন নমুনা, ঘটনাস্থলের অবস্থান এবং পুনর্নির্মাণের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় নথিভুক্তিকরণ করছেন।
পুলিশের দাবি, তদন্তের স্বার্থে এই পুনর্নির্মাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযুক্তদের বয়ান, ফরেনসিক রিপোর্ট, ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে ঘটনাস্থলের বাস্তব চিত্র মিলিয়ে দেখা হবে। তদন্তকারীদের আশা, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।

এবারের পুনর্নির্মাণ ঘিরে পুলিশ বিশেষ সতর্ক। কারণ, গত ৭ জুলাই একই মামলার পুনর্নির্মাণ করতে গিয়েই মৃত্যু হয়েছিল অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। পুলিশের দাবি, ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশনের সময় প্রভাস মণ্ডল এসআইটি-র সদস্য রনি সরকারের সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। অভিযোগ, সে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিও চালায়। এরপর আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রভাসকে উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার তদন্তও বর্তমানে সিআইডির হাতে রয়েছে। সূত্রের খবর, এদিনের পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনাস্থল এবং পুলিশি গুলি চালানোর পরিস্থিতিও খতিয়ে দেখছে সিআইডির প্রতিনিধি দল। কোন পরিস্থিতিতে গুলি চালানো হয়েছিল, সেই সময় উপস্থিত পুলিশকর্মীদের অবস্থান কী ছিল এবং ঘটনাস্থলের বাস্তব পরিস্থিতি কী ছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ আধিকারিকদের মতে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার দিনের আলোয় পুনর্নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনওরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয় বা অভিযুক্তদের পালানোর সুযোগ না থাকে।
উল্লেখ্য, সূর্যপুরে নাবালিকা গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনা সামনে আসার পর রাজ্যজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ, রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়। তদন্তের স্বার্থে গঠন করা হয় বিশেষ তদন্তকারী দল বা এসআইটি। এখনও পর্যন্ত এই মামলায় একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, সমস্ত বৈজ্ঞানিক তথ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক রিপোর্ট, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণের ভিত্তিতেই মামলাকে শক্তিশালী করা হচ্ছে।
এদিনের পুনর্নির্মাণ শেষ হওয়ার পর তদন্তে নতুন কোনও তথ্য বা সূত্র মিলেছে কি না, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ। তবে তদন্তকারীদের আশা, এই প্রক্রিয়া মামলার বিচারপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং প্রকৃত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আদালতের সামনে তুলে ধরতে সহায়ক হবে।