Date : 2020-09-25

মাদক কারবারিদের টোপ এড়ানো দুষ্কর

ওয়েব ডেস্ক: দিন কয়েক আগে কলকাতায় দুজন মাদক পাচারকারী ধরা পড়েছে। তাদের কাছ থেকে ১০০ কোটি টাকারও বেশি দামী হেরোইন পাওয়া গিয়েছে। মা্ত্র ৫ কিলো ওজনের হেরোইনের দাম যদি ১০০ কোটি টাকারও বেশি হয়, তাহলে এক বস্তা হেরোইন কত দামে বিকোতে পারে?

আরও পড়ুন : বাংলা না থাকলেও কলকাতার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দরের ট্যাবলো পৌঁছবে দিল্লিতে

গত ডিসেম্বর মাসে, কয়েকটি মাদক রুটের সূত্র ধরে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী বেশ কয়েক জন ভারতীয় এজেন্টকে ধরে। সেই তদন্তের সূত্রে অস্ট্রেলিয়াতেও একটা মাদকের ডেরায় হানা দেন সেখানকার ড্রাগ এনফোর্সমেন্টের অফিসাররা। কোকেন আর সাইকোট্রপিক ড্রাগ মেটামফেটামাইন মিলিয়ে ১৩০০ কোটি টাকার মাদক বাজেয়াপ্ত হয়। ধরা পড়ে একাধিক বিদেশিও।

কোকেনের চাইতে হেরোইনের দাম বেশি। হেরোইনের দাম কোকেনের চার গুণ। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের ডিটেকটিভ শার্লক হোমস খুব বিপন্ন অবস্থায় কোকেন নিতেন। বন্ধু ডাঃ ওয়াটসন তাতে চিন্তিত ছিলেন। তবে, তিনি জানতেন কেন হোমস কোকেন নেয়। নতুন কোনও রহস্য হাতে না-এলে শার্লক হোমস কোকেন নিতেন। যদিও তিনি নিজেও জানতেন, এই কোকেন, চণ্ডু-চরসের কারবার অপরাধ জগতেরই কারবার। হোমস কি তখন জানতেন, আজকের পৃথিবীতে মাদকের অবৈধ ব্যাবসা কত ভয়াবহ আকার নেবে? বিলেতি জাহাজঘাটার কানাগলি ছাড়িয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের কতখানি ভিতরে তা ছড়িয়ে পড়বে? এমনকী, কোনও কোনও দুর্গম জায়গায় পাতালে পর্যন্ত মাদক বানানোর ল্যাব তৈরি হবে?

আরও পড়ুন : ছোট্টো মেয়ের আবদার মেটাতে ওয়াকারকে রোলার কোস্টার বানিয়ে দিলেন বাবা! দেখুন ভিডিও

মেটামফেটামাইন মাদকের আধুনিক সংস্করণ। সিনথেটিক ড্রাগ। ক্যানসার রোগীদের জন্য মরফিন লাগে। তাঁদের যন্ত্রণা উপশমের জন্য চিকিৎসকরা মরফিন প্রেসক্রাইব করেন। মাদকাসক্তদের মেটামফেটামাইন সরবরাহের জন্য এই মরফিন জাতীয় ওষুধ আমদানি-রফতানির রুটও মাদকের কারবারিরা এখন ব্যবহার করছে। কারণ তারা জানে, ঘুষ দিলে সব দরজাই খুলে যায়।

আরও পড়ুন : জাতীয় সুরক্ষা আইনের আওতায় দিল্লি, গ্রেফতারিতে ক্ষমতা বাড়ল পুলিশের

১৯৬০-এর দশকের শেষ থেকে প্রচুর পরিমাণে হিপি এসে ভারতীয় উপমহাদেশে ভিড় জমাত। মূলত তারা যেত নেপালে। সেখানে তখন গাঁজা, চরসের পাশাপাশি এলএসডি-র ব্যাপক চাহিদা। দুনিয়া হামনে দিয়া কেয়া, দুনিয়া হামসে লিয়া কেয়া? দম মারো দম! কলকাতায় এলে তাদের পাল্লায় পড়ত কিছু ‘কাব্যে পাওয়া পলাতক ক্ষীণ কবির দল’। নেপালে তখন মাদকের পাশাপাশি জুয়ার ঠেকও দারুণ চলছে। হিপি সেজে যারা তখন ভারতীয় উপমহাদেশে আসত তারা অনেকেই ছিল আমেরিকান মালটি-মিলিওনেয়ারদের ছেলেমেয়ে। ‘ভোগী’ জীবনে তাদের ধিক্কার জন্মে গিয়েছিল। না হলে আমেরিকার মরুভূমিতেই ছিল মাফিয়া ডন বাগসি সিগেলের তৈরি করা জুয়ার স্বর্গ লাস ভেগাস। ফ্রান্সের সমুদ্রতটে মন্টি কার্লো। ১৯৬০-এর দশক থেকে তারা ভারতে ঢুকতে শুরু করে একটু হঠযোগের আশায়। বলা বাহুল্য বিরিঞ্চি বাবাদের খপ্পরে পড়ত। দিল্লি-কলকাতা-কাটমাণ্ডুর বিমান বন্দরে খাজুরাহোর ছবিওয়ালা ইন্ডিয়ান হেরিটেজের বই বিক্রির রমরমা তখন থেকে। আর তখন থেকেই, আমেরিকার টানে, কলকাতার অনেক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সুখী গৃহকোণে কাচের শো-কেসে শোভা পাচ্ছে ভ্যাট সিক্সটিনাইনের ছোট্ট ছোট্ট বোতল। বিলেত-আমেরিকা-পশ্চিম জার্মানিতে কার কজন আত্মীয় থাকে, পুজো মণ্ডপের আড্ডায় এমন খোশগল্পের শুরু তখন থেকেই। ভোগ আর রোগ থেকে মুক্তির জন্য যোগের ফ্যাশনেরও সেই শুরু।

পরে, আরও ভালো ভালো ‘হট’ বাবা-র টানে ভারতে আরও বেশি সংখ্যায় বিদেশি আসতে আরম্ভ করল। কারণ, ‘আয়রনম্যান’ নীলমণি দাস তো আর বিদেশে বিকোয় না। গলায় রুদ্রাক্ষ ঝুলিয়ে, টি-শার্টের ফাঁক দিয়ে লোমশ বুক মেয়েদের দেখাতে না-পারলে পৌরুষ কিসের? পুরুষের সুগন্ধী কিংবা বিদেশি বলবর্ধক ওষুধ তখন অবশ্য কলকাতার সর্বত্র পাওয়া যেত না। তবে চৌরঙ্গিতে মিলত। সেই সময়েই উঠল বেলবটম প্যান্ট, চকরাবকরা জামা, আমসত্ত্বের মতো গালপাট্টা, বুলেট খোদাই-করা চওড়া বেল্ট। ড্রেন পাইপ প্যান্ট-সূচলো বুটের পরের ধাপ। হঠযোগীর পর রজনীশ। সুগার কিউবে পোরা এলএসডি-র পর ব্রাউন সুগার। ওই একই সময়ে সিআইএ-র কেস অফিসার হাওয়ার্ড হার্ট কলকাতায় এসেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাওয়ার্ড হার্টের ছেলেবেলা কলকাতাতেই কেটেছিল। বাবা ছিলেন ব্যাংকার। একে পিতৃপুরুষের সূত্রে আন্তর্জাতিক স্তরে ব্যাংকারদের সঙ্গে ওঠাবসা, তায় আমেরিকান গুপ্তচর বাহিনীর ব্ল্যাক অ্যাকাউন্ট। টাকার কোনও অভাব হয়নি।

তথন আফগানিস্তানে সবে রাশিয়ার লাল ফৌজ ঢুকেছে। তাদের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ চালানোর জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনীর টাকা ছড়ানোর দরকার ছিল। ১৯৭০-এর দশকে হিপিরা যখন কলকাতায় আসত তখন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে কিছু উপজাতি গোষ্ঠী বংশ পরম্পরায় আফিম চাষ করত। ১৯৮০-র দশক থেকে সেই মাদকের চাষ দেখতে দেখতে ফুলেফেঁপে উঠল। শুরু হল চোরাপথে মাদকের বিনিময়ে অস্ত্রশস্ত্র আর বিদেশি মুদ্রা আমদানি। এক দশক বাদে রাশিয়ার সেনাবাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ল। কিন্তু তত দিনে মাদকের নেশা কুরে কুরে প্রায় গোটা আমেরিকাকেই খেয়ে ফেলেছে। আমেরিকার ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি-ও (ডিইএ) মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে নেমে ফেল মেরেছে। ভারতের ল’ এনফোর্সমেন্টের সামনে এই মাদক কারবার দমনের চ্যালেঞ্জ তো অনেক বেশি কঠিন!

drug

এখন চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। কারণ, মেটামফেটামাইনের মতো সিনথেটিক ড্রাগ এসে গিয়েছে। মাদকের আরও নিত্যনতুন সংস্করণ বের হচ্ছে। এগুলির তীব্রতা বেশি, কিন্তু ল’ এনফোর্সমেন্টের পক্ষে তার হদিশ পাওয়া কষ্টকর। এক সময় আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্সে পূর্ব জার্মানির মহিলা অ্যাথলিটরা অনেক সোনা-রুপো পেতেন। একাধিক গেমসের সময় ড্রাগ টেস্টে তাঁরা ফিট সার্টিফিকেটও পেয়েছিলেন। এমন ধরনের মাদক ওই অ্যাথলিটরা তখন ব্যবহার করেছিলেন, টেস্টের সময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও যার হদিশ পাননি। পরে ধরা পড়ে। এ রকম একাধিক মহিলা অ্যাথলিটের পদকও সেই কারণে কেড়ে নেওয়া হয়। একই ব্যাপার ঘটে কানাডার দৌড়বীর বেন জনসন এবং বিখ্যাত ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনার ক্ষেত্রে।

এই ধরনের সাইকোট্রপিক-সিনথেটিক ড্রাগ যদি ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে ঢালাওভাবে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সেই কারবার ঠেকাতে যে ধরনের ব্যবস্থার দরকার, ভারতের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যুরোয় কি সেই ধরনের ব্যবস্থা আছে? ১৯৯০-এর দশকে মাদক কারবারিদের দমন করতে লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া-র সরকারকে সেনা নামাতে হয়েছিল। ড্রাগ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয়েছিল। ২০১৬ সালে ফিলিপিন্সের ক্ষমতায় বসে রডরিগো দুতার্তে মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। তাঁর নির্দেশে মাদক চক্রের মোকাবিলায় নেমে ফিলিপিন্সের সেনাবাহিনী মাফিয়াদের পোষা হাজার দুয়েক গুণ্ডা ও জঙ্গিকে খতম করে। তাঁর এই পদক্ষেপে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, এমন অভিযোগ তোলেন খোদ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। অর্থাৎ, মাদকের কারবার ঠেকাতে কঠোর পথ নেওয়াও অনেকটা ক্ষুরের উপর দিয়ে হাঁটার মতো।

বছর তিন-চার আগে, হো চি-মিনের দেশ ভিয়েতনামে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারি ও জুয়াড়িদের কাছ থেকে মোটা টাকা ঘুষ নেওয়ার অপরাধে পুলিশের এক শীর্ষকর্তা বরখাস্ত হন। এ ভাবে ঘুষ দিয়ে ভারতেও এই চক্র কতদূর পর্যন্ত জাল বিস্তার করেছে, তার উত্তর কে দেবে?