মিলন কর্মকার, নিজস্ব প্রতিনিধি: বাঁকুড়ার হিড়বাঁধ ব্লকের মশিয়াড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের দিগতোড়ে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায়ের এই পুজো এবার পা দিল ১৩২ বছরে। আর এই পূজাকে কেন্দ্র করে আজও গ্রামীণ সমাজে বিরাজ করছে শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য।

স্থানীয়রা জানান, বাংলার ১৩০১ সালে প্রথম সূচনা হয়েছিল এই পুজোর। পুরুলিয়ার কাশিপুরের এক মহারাজার অনুপ্রেরণাতেই গ্রামের রায়েরা পুজো শুরু করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে গোটা অঞ্চলে দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল না। কেবল পুরুলিয়ার বাতিকরা গ্রামে ক্ষত্রিয় সমাজের পুজো হত। তাই দিগতোড়ের মানুষ দূরপথে না গিয়ে নিজের গ্রামে পুজো শুরু করেন। শুরুতে ছিল মাটির মন্দির, পরে সেই মন্দির হয়েছে পাকা ও আরও আকর্ষণীয়। উদ্বোধন করেছিলেন কাশিপুরের মহারাজ স্বয়ং।

গ্রামের আকর্ষণ গ্রামের মাঝখানে একসাথে রয়েছে চার মন্দির। দুর্গামন্দিরের ডান পাশে শিবমন্দির, সামনে হরিমন্দির এবং তারও একটু সামনেই কালীমন্দির, সব মিলিয়ে এক অনন্য পরিবেশ। বর্তমানে দিগতোড় গ্রামে রয়েছেন ১৪০টি রায় পরিবার। পুজোর চারদিন প্রতিটি পরিবারই ব্যস্ত থাকে অতিথি আপ্যায়ন ও পুজোর নানা কাজে।পুজোর উদ্যোক্তাদের কথায়, আমাদের পূর্বপুরুষের হাত ধরেই এই দুর্গাপুজোর সূচনা। সেই সময় থেকে আজ অবধি একই নিয়ম মেনে চলে আসছে এই মহোৎসব।

প্রায় কুড়ি বিঘা সম্পত্তি রয়েছে মায়ের নিজের। সেই সম্পত্তি থেকেই পুজোর ব্যয়ভার বহন করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনুদানও মেলে, যা পুজোর আয়োজনকে আরও সমৃদ্ধ করে।

গ্রামের যাঁরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন, তারাও এই কয়েকটা দিন সব কাজ ছেড়ে ফিরে আসেন পুজোতে সামিল হতে। এক কথায়, দুর্গাপুজোই গ্রামের প্রতিটি পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
পুজোর দিনগুলোতে মণ্ডপ চত্বর ভরে ওঠে ভক্ত আর দর্শনার্থীর ভিড়ে। আশেপাশের গ্রাম থেকেও হাজারো মানুষ এসে মিলিত হন আনন্দ-উৎসবে। আর দশমীর দিন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা যেন পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। ঢাকের তালে, আলো আর উচ্ছ্বাসের আবহে সেই শোভাযাত্রায় সামিল হন অসংখ্য মানুষ, যা গ্রামে এক অনন্য রঙের ছোঁয়া এনে দেয়।
এই পুজোর অন্যতম বিশেষত্ব হল ছাগ বলি। সপ্তমীর দিন থেকে শুরু হয় ছাগ বলি হয়। সন্ধিপুজোয় হয় ছাগ বলির পাশাপাশি কুমড়ো ও আখ, জামির বলি। নবমীতে হয় প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি ছাগ বলি। অষ্টমী ও নবমীতে অন্নভোগের আয়োজনও থাকে ব্যাপক। অন্নভোগ বিতরণে উপচে পড়ে ভক্তদের ভিড়। গ্রাম জুড়ে থাকে চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা।
এবারও পুজোকে ঘিরে থাকছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একদিন অর্কেস্ট্রা ও দু’দিন যাত্রাপালা পরিবেশন করবে পেশাদার দল। পুজোয় পুরোহিত আসেন পুরুলিয়ার বনকাটি গ্রাম থেকে, সঙ্গে থাকেন স্থানীয় পুরোহিতরাও।
শতবর্ষ পেরিয়ে আজও দিগতোড়ের দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, একে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে মিলনমেলা, যেখানে একসাথে মেতে ওঠেন গ্রামের মানুষ, আত্মীয়-স্বজন ও অতিথিরা।