কিশোরীকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে পাচারের অভিযোগ। বিহারের মুজাফফরপুরে নিষিদ্ধপল্লীতে বিক্রির চেষ্টা। উদ্ধার করল মালিপাঁচঘড়া থানার পুলিশ।
রণজিৎ রায়, নিজস্ব সংবাদদাতা : সারা ভারতবর্ষজুড়ে মানব পাচারের শিকার হচ্ছে বহু কিশোরী। ওয়েব সিরিজ আবার প্রলয় চোখের সামনে ভেসে উঠল সালকিয়ার মালি পাঁচ ঘড়া থানা অঞ্চলে। বাড়ি থেকে সাত মাস বন্দি অবস্থায় কাটাতে হল দশম শ্রেণির ছাত্রীকে।

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যেভাবে হিউম্যান ট্রাফিকিং বেড়ে যাচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি দেখা গেল সালকিয়াতে। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের ‘আবার প্রলয়’ ওয়েব সিরিজে যেভাবে গ্রামের মেয়েদের বিয়ে করার নাম করে বিক্রি করে দেওয়া হতো। তারই প্রতিচ্ছবি দেখা গেল হাওড়ার মালি পাঁচঘড়া থানার অন্তর্গত সালকিয়ায়। একটি মেয়ের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটল। সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে যেভাবে দেখানো হয় কিশোরীদের বিয় করে তাদেরকে পরিবারের থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অকথ্য অত্যাচার চালানো হয়। পরবর্তী সময়ে নিষিদ্ধপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়ার প্রচেষ্টা করা হয়। ঠিক তেমনই ঘটল সালকিয়ার ওই কিশোরীর সঙ্গে।
সময়টা ছিল ২০২৫-এর এপ্রিল মাস। স্কুলে যাওয়ার নাম করে মেয়েটির বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। স্কুলের সামনে থেকে তার প্রেমিক তাকে ট্যাক্সি করে কলকাতা স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তারা পাড়ি দেয় দুর্গাপুরের উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে বিহারের মুজাফফরপুরে ছেলেটির বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখে ওই ক্লাস ১০-এর ছাত্রীকে। পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ছেলেটির বাড়ি মুজাফফরপুরে পিএস রাঙ্গোলি চক, দুর্গা মন্দিরের কাছে। পুলিশ সুত্রে জানা যাচ্ছে এর আগেও আরও দুটি মেয়ের সঙ্গে এই ধরণের ঘটনা ঘটিয়েছে ওই যুবক অবিনাশ সিং। এখানকার পুলিশ যখন ওই এলাকার পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে, প্রাথমিকভাবে সাহায্য করলেও পুরোপুরি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় না। তারপর খবর পাওয়া যায়, মেয়েটিকে দিল্লিতে রাখা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ সাহায্যের হাত সরিয়ে দেওয়ার কারণে তদন্ত করতে প্রায় ৭ মাস সময় লেগে যায় বলে অভিযোগ। অবশেষে ওই স্কুলছাত্রীকে মুজাফফরপুর থেকেই উদ্ধার করে সালকিয়ার মালিপাঁচঘড়া থানার পুলিশ। অবিনাশ সিং ওরফে অবিনাশ মাহাত সিং নাম নিয়ে ইনস্টাগ্রামে ওই ছাত্রীর সঙ্গে প্রেমের জালে ফাঁসায় অভিযুক্ত। ইনস্টাগ্রামে বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে প্রেমে পরিণত হয়। ছেলেটির উপর বিশ্বাস জন্মায় দশম শ্রেণির ওই ছাত্রীর। তাকে বহুভাবে বিবাহের প্রস্তাব জানায় এবং মেয়েটিও সেই প্রস্তাবে রাজি হয়। বাড়িতে থাকা তিন বোন ও এক ভাই ও বাবা মার ভালোবাসা ভুলে ছেলেটির হাত ধরে সে বিয়ে করতে চলে যায় অবিনাশের সঙ্গে। বিহার ও ইউপি তে জাতপাতের একটা বড় সমস্যা আছে। মাহাতোরা অপেক্ষাকৃত নিচু জাতের বলে মনে করা হয়। সেজন্য মাহাতর বদলে ইনস্টাগ্রামে সিং পদবী ব্যবহার করে অবিনাশ। যাতে করে উঁচু জাতের মেয়েরাও প্রলোভনে পা দেয়। এই নারী পাচার চক্র যাতে সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে হয় তার জন্য সবরকম সাহায্য করে অবিনাশের পরিবার।
সাত মাসের চেষ্টায় মালিপাঁচঘরা থানার পুলিশ মেয়েটিকে মুজাফফরপুর থেকে উদ্ধার করে কলকাতায় নিয়ে আসে এবং তার পরিবারকে হাতে তুলে দেয়। মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে জানতে পারা যায় তাকে প্রথমে দুর্গাপুর এবং সেখান থেকে মুজাফফরপুরে প্রায় এক মাসের কাছাকাছি রাখা হয়। তারপর তাকে দিল্লির এক নিষিদ্ধপল্লীতে বিক্রি করতে চলে যাওয়া হয়। কিন্তু মেয়েটি হারিয়ে যাওয়ার পর থানাতে যখন মিসিং ডায়েরি হয়, পুলিশ তৎপরতায় মেয়েটিকে খোঁজার চেষ্টা করে মালিপাঁচঘড়া থানার পুলিশ। মোবাইল লোকেশন ও অন্যান্য টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে মেয়েটির কাছাকাছি পৌঁছেও তাঁদের খালি হাতে ফিরে আসতে হয়। মোজাফফরপুর ও দিল্লিতে অনেকবার যাওয়ার পরও মেয়েটিকে পাওয়া যায়নি।
মেয়েটিকে যেখানেই রাখা হতো, সেই ঘরের মধ্যে তালা দিয়ে রাখা হতো। বেঁধে দেওয়া হত হাত। যাতে সে কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। তার পাশাপাশি বেধড়ক মারধরও করা হত। একদিন মেয়েটি কোনরকমভাবে হাতের বাঁধন খুলে ফেলে। পাশ দিয়ে যাওয়া এক মহিলার থেকে ফোন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাড়ির লোকেরা জানাতে পারে, সে কোথায় কীভাবে, কী পরিস্থিতিতে রয়েছে। দিনের পর দিন বন্দি অবস্থায় থাকা এবং সারাদিন খেতে না পাওয়ার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে মেয়েটি। সোমবার মালিপাঁচঘরা থানার পুলিশ মেয়েটিকে মোজাফফরপুর থেকে উদ্ধার করে তার বাবা-মায়ের হাতে ফিরিয়ে দেয়। ঘরের মেয়েকে পেয়ে খুশি বাড়ির সদস্যরা।

তবে মেয়েটিকে উদ্ধার করার পরও অবিনাশ এবং তার বন্ধুদের কাছ থেকে বিভিন্নরকম হুমকি ফোন বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আসছে বলে অভিযোগ। মেয়েটির বাবাকে মেরে ফেলার হুমকি, মেয়েটি এবং তার বোনেদের তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ নিয়ে আবার থানার দ্বারস্থ হয়েছে মেয়েটির পরিবার। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অপহরণ এবং মানব পাচারের কেস দায়ের করা হয়েছে অবিনাশ সিংয়ের বিরুদ্ধে।