বাংলাদেশের বাজারে ভারতের দখল!

গতবছর অগস্ট মাস থেকেই হাসিনা সরকারের পতনের দরুণ টালমাটাল দেখেছে বাংলাদেশ। সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব এখনও দৃঢ়।

রিমা দত্ত, সাংবাদিক: বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হল সে দেশের টেক্সটাইল শিল্প। আর এবার সেই শিল্পের উপরই এখন কালো মেঘের ঘনঘটা। বাংলাদেশে হু হু করে কমছে সুতো বিক্রি। গত ২ বছরে সুতোর বিক্রি কমে গিয়েছে অন্তত ৩০ শতাংশ। এর ফলে একাধিক টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গিয়েছে সে দেশে। বাংলাদেশের শীর্ষ সংবাদমাধ্যমের তথ্যই বলছে সেই দেশে এই মুহূর্তে বেশ চাপে রয়েছে বস্ত্রবয়ন শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশের এই চাপ বেড়ে যাওয়া আসলে কীসের ঈঙ্গিত? বাংলাদেশের এক ইংরেজি মাধ্যম সংবাদসংস্থায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভারত থেকে সুতো আমদানি বেড়েছে ৪১ শতাংশ। এ ছাড়াও একাধিক টেক্সটাইল মিল একটুও লাভ না রেখেই সুতো বিক্রি করছে আর নাহলে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে, সেই দেশের সুতো তৈরির যে ইন্ড্রাস্ট্রি, তা যে ভীষণই টলমল, সেই কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বাংলাদেশের টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি এমন এক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে বাংলাদেশের থেকেও সস্তায় সুতো তৈরি হয়। ভারত থেকে সেই সুতো যখন রফতানি করা হয়। তখন বাংলাদেশের বাজারেই সে দেশের সুতোর চাহিদা কমে যায়। ভারতের সুতো উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি হয়। এ ছাড়াও ভারতে অনেক ধরনের সুতো পাওয়া যায়, ফলে, ভিন্ন ভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করতে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সুতোর প্রয়োজন হলে ভারতীয় সুতো ছাড়া গতি নেই।

তথ্য বলছে,

বর্তমানে বাংলাদেশে স্থানীয় ৩০ কাউন্ট সুতোর দাম কেজি প্রতি
২.৯৫ ডলার থেকে ৩.০৫ ডলারের মধ্যে
ভারত থেকে রফতানি করা সুতো সে দেশে কেজি প্রতি
মাত্র ২.৬৮ ডলার থেকে ২.৭২ ডলারের মধ্যে পাওয়া যায়
ভারতীয় সুতো কিনলে প্রতি কেজিতে প্রায় ০.৩ ডলারের সাশ্রয় হয়
২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের এক একটি মিলে
বছরে ২ হাজার ২৫০ কিলোগ্রামের চেয়ে বেশি সুতো প্রয়োজন হয়
বছরে প্রায় ৬৭৫ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮২ হাজার টাকা সাশ্রয় হয় তাদের

আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল চাহিদা বাংলাদেশের কাপড়ের। বস্ত্র রফতানিতে চিন ও ভারতকে টক্কর দেয় পদ্মাপারের দেশ। কিন্তু সেই বাংলাদেশই বস্ত্রবয়ন শিল্পে চাপের মুখে।
গত ২ বছরে বাংলাদেশ ও ভারতের সুতোর দামে পার্থক্য বেড়েছে হু হু করে। ফলে, বাংলাদেশের সুতোর বাজার ইতিমধ্যেই দখল করে ফেলেছে ভারতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের সুতো। অন্যদিকে, বাংলাদেশের টেক্সটাইল সেক্টরে ঋণ দিতে ভয় পাচ্ছে সে দেশের ব্যাঙ্কগুলো। ফলে এক প্রকার বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিয়েছে ভারত। আর তাতেই আপাতত বেশ চাপেই রয়েছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল সেক্টরগুলি। বাংলাদেশ বস্ত্রবয়ন শিল্পের কাঁচামাল ভারত ছাড়াও আমদানিতে এগিয়ে কে?

চিন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। এর মধ্যে চীন ও ভারত প্রধান উৎস, কারণ এ দেশগুলি থেকে সুতো ও কাপড়ের মতো মূল উপকরণ আমদানি করা হয়। এছাড়া, আফ্রিকার দেশগুলো থেকেও তুলাসহ অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করা হয়। তবে বাংলাদেশে পোষাক তৈরির জন্য সুতো রপ্তানিতে চিনের থেকে এগিয়ে ভারত।

কোয়ালিটি, কোয়ান্টিটি দুটোতেই সেরা ভারতীয় সুতো। চীন থেকে বাংলাদেশ বেশি পণ্য আমদানী করলেও, চীন সেইভাবে বাংলাদেশের বস্ত্র বাজারে প্রভাব ফেলতে পারেনি। রপ্তানি শুরুর পর চার দশক কেটে গেলেও এখনো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কাঠামোগত দিক থেকে দৃঢ় ভিত তৈরি করতে পারেনি। দেশের প্রধান রপ্তানি খাত হলেও কাঁচামালের জন্য এ শিল্পকে বহুলাংশেই অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কাঁচামালের নিজস্ব উৎস তৈরি করা না গেলে সামনে বিপদে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও দেশের শীর্ষ ২০ আমদানির উৎস দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ভারত থেকে ৯০০ কোটি পণ্য আমদানি করা হয়, যা মোট আমদানির ১৪ শতাংশের বেশি। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক টানা-পোড়েনের কারণে কিছুদিন দুই দেশের মধ্যে আমদানি অনেকটাই কমে যায়। দ্বিপাক্ষিক ফাটল দেখা দেয় দুই দেশের মধ্যে। তবে এখন অনেকটাই স্বাভাবিক পরিস্থিতি। বাংলাদেশ এখন ভালোই বুঝেছে বেশি ভারত বিদ্বেষী দেখিয়ে লাভ নেই। দামে কম মানে ভালো পণ্য কিনতে গেলে ভারতের কাছেই হাত পাততে হবে বাংলাদেশকে। ফলে ভারত কাঁচামাল দেওয়া বন্ধ করে দিলে, বাংলাদেশের বস্ত্রবয়ন শিল্পে এর প্রভাব পড়বে।