ইউনুসকে কী নির্দেশ দিল আন্তর্জাতিক মানবাধিক সংগঠন?
জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: ইউনুস নাকি তলে তলে দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। দাবি করছেন ইউনুসের দলেরই বেশ কয়েকজন। তাহলে কি বিপদের বাংলাদেশ থেকে সেফ এক্সিট খুঁজতে দিল্লির দারস্থ হচ্ছেন ইউনুস ? এটা একটি প্রশ্ন। আরও একটা প্রশ্ন রয়েছে। আওয়ামী লীগ অর্থাৎ হাসিনার দলকে ফের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনবেন সেনাপ্রধান ওয়াকার। দেখুন ইউনুস দিল্লির সাহায্যে সেফ এক্সিট করবেন কিনা সেটা পরের বিষয়। আর দিল্লি ইউনুসকে সাহায্য করবেন কিনা সেটাও আলোচনার বিষয়। তবে, প্রথম থেকে দিল্লির একটাই দাবি বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন। আর সেই নির্বাচন হতে হবে ইনক্লুসিভ অর্থাৎ বাংলাদেশের নির্বাচন হবে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ মূলক। আর সেখানে থাকবে আওয়ামী লীগও।

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সমস্ত রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ। এমনকি তারা ভোটে লড়াই করতেও পারবেন না, জানিয়েছে সে দেশের নির্বাচন কমিশন। তাদের প্রতীকও বাতিল করা হয়েছে। কিন্ত দিল্লির দাবি, ইউনুসকে হাসিনার দলের উপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। আর সেটা কীভাবে সম্ভব। সেটা ভেবে বের করতে হবে স্বয়ং ইউনুসকে। আর এখানেই তো টুইস্ট। কারণ এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগে এলার্জি জামাত, এনসিপি ও বিএনপি-র। আর তিন রাজনৈতিক দলের চাপেই অন্তবর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক জেলে বন্দি। এমনকি জেলের মধ্যে অনেক আওয়ামী কর্মী মারাও গিয়েছেন অত্যাচারে।
দিল্লি বলছে আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে ইউনুস সাহেবকে। আর ঠিক তখনই এক ভয়ঙ্কর চাল দিলেন ইউনুস। তিলি সেফ এক্সিটের রাস্তা খুঁজছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণকে বিপদে ফেলে নিজে বাঁচতে চাইছেন পালিয়ে। আর সেই সুযোগ ইউনুসকে করে দিচ্ছে কে জানেন,ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা। প্রত্যকেই আপনারা জানেন, নিউইয়র্কে সদ্য শেষ হওয়া জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন ইউনুস। সেই অধিবেশনের ফাঁকে তিনি একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন। আর সেই বৈঠক শেষে, ইউনুস বাংলাদেশে ফেরার পরে, তাঁর দফতরে পৌঁছায় ওই ৬টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের তরফে একটি খোলা চিঠি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিবি কাস্ট, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট, ৩৫ রাইটস, রবার্ট এফ, কেনেডি হিউম্যান রাইটস এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট – এই ছয়টি সংস্থা একযোগে খোলা চিঠি দিয়েছে ইউনুসকে। চিঠির বিষয়বস্তু একটু পরে আপনাদের জানাব।
এবার আসা যাক ওয়াকারের প্রসঙ্গে। কেন তিনি হাসিনার দলকে বাংলাদেশে ফেরাতে চাইছেন। বেশ কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে আলোচনা চলছে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনবে ক্যান্টনমেন্ট। এর পিছনে কি কোনও স্বার্থ রয়েছে জেনারেল ওয়াকারের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াকারের স্বার্থ রয়েছে কিনা সেটা সময় বলবে। কিন্তু যদি সেনা হাসিনাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চায়, তাহলে গতবছর হাসিনার পতনে যে চক্রান্ত তৈরি হয়েছিল তাতে বড় ভূমিকায় থাকত না সেনা। সেনার সহযোগীতায় বাংলাদেশে হাসিনার পতন হয়েছে, এমনই মত বহু বিশেষজ্ঞের। সেনা চাইলে চাইলে ৫ অগাস্টের দিন কোনওদিন আসত না বাংলাদেশে। অন্যদিকে ইউনুসকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য সেনা সাহায্য করলেও সেই সেনা এখন ক্ষিপ্ত ইউনুসের উপর। আপনারা প্রত্যেকেই জানেন বাংলাদেশ সেনা এখন দুই ভাগে বিভক্ত। সেনার একটা পক্ষ ওয়াকারের উপর ক্ষিপ্ত। কারণ ২৫ জন সেনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। তাঁর মধ্যে ১৫জনকে সেনা হেফাজতে নিয়েছে। অর্থাৎ ১৫ জন সেনাকে গ্রেফতার করেছে সেনা। আর অন্যদিকে সেই সেনা হেফাজতেই তৈরি হয়েছে সেনা নিবাশ। আর এই সেনা নিবাস তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনুসের অন্তবর্তী সরকার। ফলে ইউনুসের উপর ক্ষিপ্ত সেনার অপর অংশ। কিন্তু সেনা চাইলে এই পরিস্থিতি এড়াতে পারত, মত ওয়াকার বিরোধীদের। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের সেনা নিবাসে একটা জটিল পরিস্থিতি এখন।
আর এর মধ্যেই স্বাক্ষরিত হল, জুলাই সনদ। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের সম্মতি ছাড়াই জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে মজার বিষয় হল যারা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা বলে দাবি করেন তারাই ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। জাতীয় নাগরিক পার্টি জুলাই সনদে স্বাক্ষরও করেনি। জুলাই যোদ্ধা বলে পরিচিতরা ইউনুসের বিরুদ্ধে কথা বলেন। জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত অনুষ্ঠানের ঠিক ২৪ ঘন্টা আগে বাংলাদেশে প্রবল বিক্ষোভ দেখা যায়। তথাকথিত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে পুলিশের খন্ডযুদ্ধ বাঁধে। আহত হন প্রায় ৩৬ জন। অন্যদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, হাসিনার দলের ঝটিকা মিছিল অনেক কমে গিয়েছে। এটাও নজর এড়ায়নি কারো। তবে কি বড় যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য ক্ষনিকের নীরাবতা ?
এবার আসা যাক ওই চিঠির বিষয়ে। আগামী বছরের গোড়ায় বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ। আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে তাদের বিচার চলছে। যদি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি না হয় তাহলে তাদের নির্বাচনে লড়াই করা অসম্ভব। আর এটাই ইউনুসের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে আওয়ামী লীগ নিয়ে জামাত ও এনসিপির ক্রমাগত চাপ। খালেদার দল বিএনপি যদিও আওয়ামী প্রসঙ্গে দ্বিধাবিভক্ত। জামাতের চাপ সামলে হাসিনার দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা বেশ কঠিন ইউনুসের কাছে। গতমাসে এক সাক্ষাৎকারে ইউনুস নিজেই জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ এখন বাংলাদেশ বৈধ। কেবলমাত্র তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িক নিষিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশে। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে ভাবছে অন্তবর্তী সরকার। ইউনুসের এই বক্তব্যের পরে এনসিপি-র তরফে একাধিক মন্তব্য আসে। জামাতও হাবে-ভাবে বুঝিয়ে দেয় তারাও বিষয়টি ভালো চোখে দেখছে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ইঙ্গিত দিয়ে ইউনুস কি জল মাপতে চেয়েছিলেন ?
যে খোলা চিঠি ইউনুস পেয়েছেন সেই চিঠিতে একযোগে ৬টি মানবাধিকার সংগঠন আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার কথা বলেছেন। এমনকি ওই মানবাধিকার সংগঠন গুলি বাংলাদেশের উন্নতির জন্য ইউনুসকে ১২টি বিষয়ে নজর দিতে বলেছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিক সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, আগের সরকারের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি বিচারের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে। হত্যা, আটক বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত যে সমস্ত মামলার যথাযথ প্রমাণ নেই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। হাসিনা সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পরে এই প্রথম মুখ খুলল হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। এই ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ইউনুস সরকারের কাছে। জানা যাচ্ছে শুধু মাত্র এই ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন নয় আরও ১০-১২ টি মানবাধিকার সংগঠনও একই দাবি জানিয়ে চিঠি দিতে চলেছে ইউনুসকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটা ইউনুসের কৌশলী চাল। কারণ তিনি নিউইয়র্কে গিয়ে মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে বৈঠকের পরে এই চিঠি এল। ফলে অনেকে এটা মনে করছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের মাধ্যমে নিজের বাঁচার পথ তৈরি করতে চাইছেন ইউনুস।