বাংলাদেশে রাজস্ব খাতে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৬৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি।
জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক:নিষেধাজ্ঞা উঠে যাচ্ছে হাসিনার দলের উপর থেকে। বাংলাদেশে স্বমহিমায় ফিরছে আওয়ামী লীগ। তাহলে কি হাসিনাও ফিরবেন দেশে ? আর লুকিয়ে থেকে নয়। লড়াই এবার আমনে-সামনে। খেলা শুরু বাংলাদেশে। হাসিনার দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ ক্রমাগত বাড়ছে ইউনুসের উপর। চাপ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহল থেকেও। বিশ্বের তাবড় ৬টি মানবাধিকার সংগঠন ইতিমধ্যে খোলা চিঠি দিয়েছে ইউনুসকে। আরও বেশ কয়েকটি সংগঠন চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইউনুসকে যে চাপে রেখেছে আন্তর্জাতিক মহল, সেই খবর বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। অন্তবর্তী সরকার চাপে থাকলে সেই খবর চেপে দেওয়া হয় বাংলাদেশে। টাকা দিয়ে মিডিয়ারও মুখ বন্ধ করতে চাইছেন ইউনুস।

মনে করা হয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির পিছনে আমেরিকার একটা হাত ছিল। ওয়াশিংটন কিন্তু ধীরে ধীরে বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহ হারাচ্ছে। আর ফাটল আরও চওয়া হয়েছে, ইউনুসের সদ্য আমেরিকা সফরে। এই সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউনুসের সঙ্গে দেখা করার কোনও আগ্রহ দেখাননি। শুধু একটি নৈশভোজের অনুষ্ঠানে তাঁদের এক ঝলক দেখা গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প সরকারের কোনও উচ্চপদস্থ আধিকারিকের সঙ্গে চেষ্টা করেও বৈঠক করতে পারেননি ইউনুস। বা বলা যেতে পারে মার্কিন সরকারের কেউ ইউসুনের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে চাননি। বৈঠক তো অনেক দূরের ব্যাপার। আর সেই বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরেই আরও চাপে পড়েছেন ইউনুস সাহেব। আর সেই সুযোগ নিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশও। তারাও একযোগে চাপ বাড়াচ্ছে ইউনুসের উপর। ভারতের প্রভাবও রয়েছে সেখানে। আর যার ফলাফল এখন সকলের কাছে জলের মত পরিষ্কার। অর্থাৎ একসঙ্গে ৬ টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের খোলা চিঠি ইউনুসকে। আর চিঠির বিষয়বস্তুও বেশ চাঞ্চল্যকর।
চিঠির বিষয়বস্তু আওয়ামী লীগকে চাই বাংলাদেশে। আওয়ামী লীগের উপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে ইউনুসকে। এমনকি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দিতে হবে। আর সেই সুযোগে করে দিতে হবে ইউনুসকেই। কারণ ইউনুসই তো জামাত-বিএনপি-এনসিপি-র চাপে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশে। সেটা তো তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। আর এটাই ইউনুসের কাছে এখন অগ্নিপরীক্ষা। বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল হচ্ছে আওয়ামী লীগ। স্বাভাবিক ভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থকও বেশি থাকবে বাংলাদেশে। আর তাদের রাজনৈতিক অধিকার হরন করা অন্তবর্তী সরকারের কাজ নয়। আবার কোন কোনও রাজনীতিবিদের বক্তব্য, কয়েকজন নেতা-নেত্রীর জন্য গোটা দল শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। হাতের পাঁচটা আঙুল তো আর সমান হয়না। ফলে আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া ইউনুসের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। যাতে আওয়ামী লীগ স্বাধীনভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।

ইউনুসের পক্ষে এত তাড়াতাড়ি এই দাবি মেনে নেওয়া কি সম্ভব ? তবে যারা রাজনীতি নিয়ে নাড়াচাড়া করেন তাদের বক্তব্য, ইউনুসকে দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। না হলে আন্তর্জাতিক মহলে তিনি আরও কোনঠাসা হয়ে পড়বেন। চাপ আরও বাড়বে তাঁর। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশনের থেকে ইউনুস চিঠি পাওয়ার পরেই বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবারই ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে ৩৫টি ঝটিকা মিছিল করে আওয়ামী লীগ। তবে কোনও ছোটখাট মিছিল ভাববেন না। ভয় পেয়ে নয়, রীতিমতো ঘোষণা করে সেই মিছিল করে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। মিছিলের জমায়েত ছিল রীতিমত চমকে দেওয়া মতো। আওয়ামী লীগের সেই মিছিলে হামলার অভিযোগ বিএনপি ও এনসিপি-র বিরুদ্ধে। এমনকি আওয়ামী লীগ সমর্থকরা অভিযোগ করেছেন, বিএনপি ও এনসিপি পুলিশের সহযোগীতায় এই হামলা চালিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের তাদের ঘরে লুকিয়ে রক্ষা করেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, আমরা জানি এরা আমাদের লোক। তাই কোনভাবেই এদের বিপদে ফেলে নিজের বিপদ বাড়াতে চাই না। আমরা প্রত্যেকে চাই হাসিনা ফিরে আসুক। দেশের হাল ধরুক। হাসিনা কবে ফিরবেন সেটার উত্তর তো দেবে সময়।
নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি-র অন্দরে বেশ কিছু রদবদল হয়েছে। বিএনপি বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসলে খালেদা পুত্র তারেক রহমানই কুর্সিতে বসবেন। সেটা আগেই ঘোষণা হয়েছে দলের তরফে। তবে তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে দলের যুগ্ম মহাসচিব পদ দেওয়া হয়েছে। এটাও তাৎপর্যপূর্ণ। বিএনপি মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি বলেন, তারেক রহমান ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই দেশে ফিরবেন। অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরে খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা তুলে নেওয়া প্রক্রিয়া শুরু হয়। খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড মকুব করে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তবে তারেক রহমান গ্রেফতারির আশঙ্কায় দেশে ফেরেননি। অন্যদিকে জামাতের অভিযোগ, গণভোটে রাজি হয়েও বিএনপি এখন জটিলতা তৈরির চেষ্টা করছে। বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে পুলিশ ও প্রশাসনে নিজেদের মতো ভাগ-বাটোয়ারা শুরু করছে বলে অভিযোগ, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের। দেখুন নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে বাংলাদেশে বিভিন্ন দলের মধ্যে কাদা ছোঁড়া-ছুড়ি বাড়বে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাকি আগের থেকে অনেকটাই ভালো হয়েছে। আমদানি-রপ্তানি শিল্পেরও উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশে। দাবি করছেন ইউনুস। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল বা আইএমএফ বাংলাদেশের ঋণ আটকে দিয়েছে। জানা যাচ্ছে, আইএমএফ বাংলাদেশকে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি দেওয়ার ব্যাপারে কিছু কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল জানিয়েছে, যতক্ষন না পর্যন্ত বাংলাদেশে স্থায়ী সরকার গঠিত হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ঋণের এই কিস্তি স্থগিত থাকবে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফ-র যৌথ বার্ষিক সভায় বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের গর্ভনর আইএমএফ-এর সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করেন। যাতে ঋণের টাকা আটকে না রাখা হয়। সেই বৈঠকে আইএমএফ কর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের পরে গঠিত সরকারের সঙ্গে ঋণের শর্তাবলী এবং বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে তারা পুনরায় আলোচনা করবেন। তাহলে এটা তো পরিষ্কার আইএমএফ-ও ইউনুসের সরকারের প্রতি তাদের অনাস্থা প্রকাশ করছে। ফলে আরও একবার মুখ থুবড়ে পড়ল ইউনুসের। এখানে আমার প্রশ্ন থাকবে, বিগত ১৫ মাসে ইউনুস সাহেব বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি শিল্পেরও উন্নতি নিয়ে যে প্রচার করে বেড়াচ্ছিলেন, তাহলে তা একেবারেই মিথ্যা প্রচার ছিল। তাই না..
বাংলাদেশ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৩ সালে অর্থাৎ হাসিনার আমলে জানুয়ারীতে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ-এর থেকে ঋণ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ওটাই শেষ। তারপর রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে বাংলাদেশে। আর তখনই ষষ্ঠ কিস্তির ঋণের জন্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার চুক্তি যুক্ত করেছে আইএমএফ। কারন হাসিনা সরকারের পতনের পরে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চিয়তাও। রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থতা এবং সংস্কারের নামে ঢিলেমি আরও প্রকট হয়েছে। আর যেটা আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত। আইএমএফ-এর এই অবস্থানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অন্তবর্তী সরকারের অদক্ষতা বলছেন। বাংলাদেশে রাজস্ব খাতে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৬৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। ২৯ অক্টোবর ঢাকা সফরে আসবেন আইএমএফ-এর সদস্যরা। দুই সপ্তাহ তারা সেখানে থাকবেন, পর্যালোচনাও করবেন সেখানের বর্তমান পরিস্থিতি। কিন্তু নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কিস্তি ছাড়ার সম্ভাবনা নেই, সেটা স্পষ্ট। আর এখানেই তো ইউনুসের ব্যর্থতা।