বাংলাদেশে বেসরকারিকরণের পথে কক্সবাজার রেল স্টেশন!

ইউনুসের সময়ে অরাজকতার বাংলাদেশ। বাড়ছে খুন-রাহাজানি। আতঙ্কে মহিলারা। দ্বিধাবিভক্ত আমজনতারাও।

জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: ইউনুস ক্ষমতায় আছে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ মাস। এই ১৫ মাসে প্রায় কয়েকশো আওয়ামী লীগ কর্মী খুন হয়েছেন বাংলাদেশে। কারও মৃত্যু হয়েছে জেলের অন্ধকার গরাদে। কিংবা নৃশংস ভাবে খুন হয়েছেন। বেশ কয়েকটি সংগঠন সেই খবর সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু হাসিনার দল আওয়ামী লীগ কি বলছে। তারা কি এই পরিসংখ্যান মেনে নিচ্ছে। না, তারা মানছে না। তারা বলছে, তারা বলছে ৫ অগাস্টের পর থেকে প্রায় ২ হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী খুন হয়েছেন বাংলাদেশ। আর আহত হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার আওয়ামী লীগ কর্মী। সংখ্যাটা বাড়তে বা কমতেও পারে।

কিন্তু এখানে কি শেষ ভাবছেন। না, এখানেই শেষ নয়। আগেই আপনাদের জানিয়েছিলাম ইউনুসের সময়ে নারী সন্মান একেবারে ভুলন্ঠিত। মহিলাদের কোনও সন্মান নেই ইউনুসের বাংলাদেশে। সম্প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ একটি তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে। সেই তথ্য আমি আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নেব। শুনলে আপনি আঁতকে উঠবেন। মনে হবে ইউনুসের বাংলাদেশ একেবারে খুনি-দর্ষকদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। আর সেই রিপোর্টে বলা হয়েছে, হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩,৫৫৪টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ৪,১০০-এর বেশি মহিলা ধর্ষিতা হয়েছে। যেহেতু জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশ এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ফলে এই কয়েক মাসে সংখ্যাটা আরও কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। 

বাংলাদেশ পুলিশ আরও একটি তথ্য় প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও তাদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় ১২৩ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। যদিও শেখ হাসিনার বক্তব্য কমপক্ষে ২০০০ আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়েছেন ইউনুসের সময়ে। ফলে বলা যেতে পারে ইউনুসের বাংলাদেশে নিরাপদ নয় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। কিন্তু টুইস্ট আছে অন্য় জায়গায়। কি বলুন তো। ইউনুস এই খুনের দায়মুক্তি চাইছেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই খুনের দায়মুক্তি চাইছেন ইউনুস। এটা কি ইউনুসের নতুন চালাকি। হতেও পারে। আমরা প্রত্যেকেই জানি কোটা বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুস্থান। ৫ অগাস্ট হাসিনার পদত্যাগ। ৮ অগাস্ট ইউনুসের মসনদে বসা। কিন্তু ৮ অগাস্টের পরেও বাংলাদেশে ব্যাপক খুনোখুনি হয়েছে। আর যার মধ্যে অধিকাংশ ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থক। যদিও সেই কথা দায়িত্ব নিয়ে অস্বীকার করে ইউনুস সরকার। তাহলে হঠাত খুনের  দায়মুক্তি চেয়ে ইউনুস কি খেলা ঘোরাতে চাইছেন। ইউনুস ক্ষমতালোভী আমরা প্রত্যেকেই এতদিনে জেনে গিয়েছি এতদিনে। সংস্কারের দোহাই দিয়ে নানা ভাবে তিনি চেষ্টা করে গিয়েছেন নির্বাচন পিছিয়ে দিতে। আর এখনও সমানভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন নির্বাচন পিছিয়ে দিতে। ফলে খুনের দায়মুক্তি নিয়ে মহান সাজার নাটক করে নতুন করে সময় কিনতে চাইছেন ইউনুস। এই প্রশ্নও থাকবে।  

বলছি, ইউনুস সাহেবের যে বসয় বাড়ছে সেটা কি তিনি এবার বুঝতে পারছেন। তাই আর একা একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। অন্যের উপর তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে। নাকি অন্য কোনও সংগঠনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে অন্তবর্তী সরকার। আসলে আমি যেটা বলতে চাইছি,ইউনুস কি সম্পূর্ণ জামাত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন ? নাকি আংশিক জামাত আংশিক বিএনপি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন। দেখুন,  হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে বাংলাদেশে যা যা ঘটেছে বা এখনও ঘটে চলেছে তাতে অন্তন্ত এটা স্পষ্ট, ইউনুসকে সামনে রেখে পিছন থেকে দাবার চাল দিচ্ছে অন্য কেউ। মোদ্দা কথায় দাবার বড়ে হয়ে পেন্ডুলামের মতো ঘুরছেন ইউনুস।

ইউনুস সাহেব যে জামাত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন, সেটা কখন প্রকট হয় জানেন, যখন বঙ্গবন্ধুর ৩২ ধানমুন্ডির বাড়ি ভাঙা হচ্ছিল তখন একেবারেই নীরব ছিলেন ইউনুস। এমনকি ওই ঐতিহাসিক ভবন ভেঙে ফেলার পরেও অর্ন্তবর্তী সরকারের তরফে কোনও দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি ইউনুসও ব্যক্তিগতভাবে কোনও দুঃখ প্রকাশ করেননি। তারপর তো একেবারে রীতিমত বিজ্ঞপ্তি জারি করে জামাত ও ছাত্র শিবিরের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিজের পথ প্রশস্ত করেন ইউনুস। জামাত নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও তুলে নেন। বেশ কয়েকটি নিষিদ্ধ সংগঠনের থেকেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। আর তারপর থেকেই তো বাংলাদেশে ইসলামী কট্টরপন্থী শক্তির উত্থান একেবারে খুল্লামখুল্লা। এই জামাত এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গরা নিষিদ্ধ হয়েছিল হাসিনার সময়ে। 

হাসিনা দেশ ছাড়ার পরে প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে জেনারেল ওয়াকার কি বলেছিল মনে আছে আপানার। যদি মনে না থাকে চাপ নেই। আমি মনে করাচ্ছি আপনাদের। আসলে বছর খানেক আগের কথা তো ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। ৫ অগাস্টের পরে প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে ওয়াকার বলেছিলেন, বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইতিমধ্যে তাঁর কথা হয়েছে।  আর সেই বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ওয়াকার সবার আগে নাম নিয়েছিলেন জামাতের। কিন্তু মজার বিষয় হল। ওয়াকার যখন এই কথা বলছিলেন তখনও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ছিল জামাত। আর হাসিনার পতনের পিছনে জামাতের যে একটা বড় ভূমিকা ছিল সেটা কারও অজানা নয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন থাকবে যেটা, জেনারেল ওয়াকার কি বুঝে গিয়েছিলেন ক্ষমতায় টিকে থাকতে গেলে জামাতের লেজ ধরতেই হবে। তাই কি ওয়াকার জেনে বুঝে সজ্ঞানে জামাতের নাম নিয়েছিলেন। আসলে ক্ষমতা, আর পদ বড় বালাই। কিন্তু ওয়াকার বাবু আপনি কি এটা জানেন, আপানার সাধের জামাত, অন্তবর্তী সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আপনাকেই গদিচ্যুত করতে চাইছে।  

আর এখন তো হাসিনাহীন বাংলাদেশে ইসলামী কট্টরপন্থার রমরমা। বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন ইচ্ছা মতো ফতোয়া জারি করছে মহিলাদের উপর। ২০২৪-এর ডিসেম্বরে,বাংলাদেশের গোপালগঞ্জে   একেবারে মাইক নিয়ে প্রচার করছিল কট্টর ইসলামপন্থীরা। বলা হচ্ছিল মহিলারা কেউ বাড়ির বাইরে বেরোতে পারবেন না। বাজার, দোকানে তারা যেতে পারবেন না। এই ঘটনা প্রকাশে আসতেই একেবারে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। তবে শুধু মহিলারা নন ফতোয়ার শিকার বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরাও।

ইউনুসের বাংলাদেশের আরও একটি ঘটনা তুলে ধরি আপনাদের সামনে। পাকিস্তানের মারকাজে জামাতের সিনিয়র আলেম তিনি বাংলাদেশ সফর করেছেন সম্প্রতি। পাক ধর্মীয় নেতার আকস্মিক বাংলাদেশ সফর অবাক করেছে বাংলাদেশ প্রশাসনকেও। জানা যাচ্ছে পাক ধর্মগুরু যে বাংলাদেশে আসছেন সেটা নাকি জানতেনই বাংলাদেশ গোয়েন্দা বিভাগ। তাহলে তো বলতে হচ্ছে ইউনুসের বাংলাদেশে ইনটেলিজেল্সও ফেল। তাহলে বাংলাদেশের প্রায় আঠারো কোটি মানুষের নিরাপত্তা তো প্রশ্নের মুখে ইউনুস সাহেব। এখানেই শেষ নয়, আরও অবাক হওয়ার আছে। ওই পাক ধর্মগুরু রাজসাহী বিমানবন্দরে নামার পরে একাধিক বৈঠক করেন। কাদের সঙ্গে, কি উদ্দেশ্যে,কি বিষয়ে তিনি বৈঠক করেছিলেন সেটা অজানা। এমনকি পাক ধর্মগুরু লালমুনির হাট ও রংপুর সফরেও গিয়েছিলেন। কিন্তু কেন তিনি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেষা এই দুটি জায়গায় গেলেন সেটা ভাবাচ্ছে ভারতীয় গোয়েন্দাদের। এমন নয় তো সব জেনেও না জানার ভান করছেন ইউনুস। 

বলছি, চাপে আছেন কি ইউনুস সাহেব। বাংলাদেশের ঘটমান পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ কি ইউনুস। তাই কি ক্ষনে ক্ষনে তিনি বৈঠক করছেন। সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বাংলাদেশের সব বেঁচে দেওয়ার। এই যেমন ১১ মে যমুনাতে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করেছিলেন ইউনুস। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ইউনুসের আর্থিক পরামর্শ দাতা ও অর্থদফতরের সচিব। বৈঠকে আলোচনা হয়েছিল দেশের কোন কোন প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হবে তাই নিয়ে। বলা ভালো দেশ কি ভাবে বিক্রি করা যাবে তার একটা ব্লু প্রিন্ট তৈরি হয় বৈঠকে। অর্থাত ইউনুস মনপ্রাণ দিয়ে চাইছেন দ্রুত বাংলাদেশকে পিছনের দিকে পাঠাতে। সেই বৈঠকে নাকি আলোচনা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নাকি প্রচুর ধুলো-ময়লা জমেছে। আর সেই ধুলো সাফ করার জন্য, একাধিক বার ঝাড়ু বদল করেছে ইউনুস সরকার। কেনা হয়েছে নতুন ঝাড়ুও। আর সেই ঝাড়ুতে ভর করে কক্সবাজার রেলস্টেশন বিদেশী হাতে চলে যাচ্ছে। ক্ষমতায় এসে ইউনুস একের পর এক প্রতিষ্ঠান বিদেশীদের হাতে তুলে দিয়েছেন ইতিমধ্যে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দরও এখন বিদেশীদের হাতে। আর এবার পালা কক্সবাজার রেল স্টেশন। কারণ, ২১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আইকনিক রেলস্টেশন এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও অন্তবর্তী সরকারের কাছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চালু হলেও এখনো পুরোপুরি যাত্রীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি ছয়তলা বিশিষ্ট মূল ভবনটি। এই স্টেশন পুরো চালু হলে সরকারি কোষাগার থেকে মাসে দিতে হবে ১২ কোটি টাকা। আর যে সরকারের ভাঁড়ে মা ভবানী দশা, তাদের টাকা দেবে কোন গৌরী সেন।