বিশ্বজয়ীদের সাফল্যের পিছনে অমল মজুমদার

নিজের ব্যর্থতার, নিজের লড়াইয়ের বীজ দলের প্রত্যেকটা মেয়ের মধ্যে বুনে দিয়েছিলেন অমল মজুমদার।

জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: শুরুটা যদি এই ভাবে করি, চক দে অমল…কেমন হবে.. এক অসমাপ্ত স্বপ্নের পরিনতি। কথায় আছে কিছু স্বপ্ন নিজেই গল্প লিখে রাখে. আর ব্যর্থতা পরিনত হয় সাফল্যে. অমল মজুমদার ভারতীয় মহিলা টিমের বিশ্বকাপ জয়ী কোচ. হয়তো মাত্র কয়েকমাস আগে যে মানুষটি পরিচিত ছিলেন গুটি কয়েক মানুষের কাছে, সেই মানুষটির নাম এখন সকলের মুখে মুখে..কিন্তু একটা সময় ছিল, ভালো খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও তিনি সুযোগ পাননি জাতীয় দলে. অনেকে বলেন, ভুল সময়ে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটারদের তালিকা যদি তৈরি করা হয় তাহলে একেবারে প্রথম দিকে থাকবে অমল মজুমদারের নাম। অনেকে আবার ভারতীয় ক্রিকেটে অমল মজুমদারের নাম উঠলে অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আর সেই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে অমল মজুমদার কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের অর্ধেক বসন্ত.

চক দে ইন্ডিয়ার কবীর খানের কথা মনে আছে, কিংবা মনে আছে কোনি সিনেমায় খিদ্দার কথা. কবীর খান, যাকে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে ভারতীয় হকি দল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেই কবীর খানই কোচ হয়ে ফিরে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন একটা অনামি ভারতীয় মেয়েদের হকি দলকে.আর খিদ্দা কী করেছিলেন, বস্তি থেকে উঠে আসা কনকচাঁপা পাল ওরফে কোনিকে জাতীয় স্তরের সাঁতারু হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। অমল মজুমদারও ঠিক একই ভাবে নিজের ব্যর্থতার, নিজের লড়াইয়ের বীজ বুনে দিয়েছিলেন দলের প্রত্যেকটা মেয়ের মধ্যে.

বাস্তবের কবীর খান অমল মজুমদার, যাকে রিলের কবীর খানের মতো দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হয়নি ঠিকই কিন্তু অযোগ্য তকমা দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছিল দিনের পর দিন. সেই অমল মজুমদারই ভারতীয় মহিলা দলের কোচ হয়ে ফিরলেন. দেশকে বিশ্বকাপ জেতালেন আর প্রমাণ করে দিলেন স্বপ্ন দেখা মানুষেরা শুধু সিনেমাতেই নয়, বাস্তবেও জিতে যায়. রিচা, শেফালিদের মুখে এই মুহূর্তে
জ্বলজ্বল করছে যে বিজয়ের আলো তার নেপথ্য কারিগর পঞ্চার্ধো মানুষটি. ২ নভেম্বর রাতের নভি মুম্বইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়াম গর্জে উঠেছিল শুধু ট্রফির জন্য নয়, গর্জন ছিল এক নীরব নায়কের জন্যও। যাঁর পরিকল্পনা, ধৈর্য আর সাহস দেখিয়েছে, অসম্ভব বলে কিছু নেই. ধৈর্য্য ধরলে সবই সম্ভব। টালমাটাল পরিস্থিতি থেকেও বিশ্বজয় সম্ভব.

১৯৭৪ সালের ১১ নভেম্বর জন্ম অমল মজুমদারের.তাঁর বেড়ে ওঠা মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্ক এলাকায়. মুম্বইয়ের শিবাজী পার্ক এলাকা মূলত ক্রিকেট পাড়া নামে পরিচিত. এই এলাকার মাঠ গড়ে তুলেছে বিনোদ কাম্বলি, সচিন তেন্ডুলকরের মতো কিংবদন্তিদের। তিনি মূলত ডানহাতি ব্যাটসম্যান ছিলেন. মুম্বই ও আসামের ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেছেন. অমল মজুমদারের ক্রিকেটে হাতেখড়ি রামাকান্ত আচারেকারের হাত ধরে. যার হাত ধরে ক্রিকেট বিশ্বের দরবারে পরিচয় পেয়েছিলেন সচিন টেন্ডুলকর. ১৯৯৩-৯৪ মরসুমে রঞ্জি টফ্রির একটি ম্যাচে মুম্বইয়ের হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের মাধ্যমেই ময়দানে পা রেখেছিলেন অমল মজুমদার. সেই সময় ফরিদাবাদে হরিয়ানার বিপক্ষে ২৬০ রান করেছিলেন তিনি. এরপর ১৯৯৪ সালে ইংল্যান্ড সফরের জন্য ভারতীয় অনুর্ধ্ব ১৯ ক্রিকেট দলের সহ-অধিনায়ক হিসাবে অমল মজুমদারকে মনোনীত করা হয়েছিল. ১৯৯৪-৯৫ মরসুমে রাহুল দ্রাবিড় এবং সৌরভ গাঙ্গুলীর সঙ্গে ভারতীয় এ দলের হয়ে খেলেছিলেন অমল মজুমদার.
কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে মানুষটাকে সচিনের সঙ্গে তুলনা করা হত, সেই মানুষটাকে কখনও ভারতের জাতীয় দলে খেলার জন্য নির্বাচিত করা হয়নি. তার সমসাময়িক খেলোয়াড়রা সুযোগ পেলেও অমল মজুমদার ছিলেন ব্রাত্য. কারণ, মিডিল অর্ডারে তখন দ্রাবিড়-লক্ষ্মণের মতো ক্রিকেটারদের ভিড়. রঞ্জি টফ্রিতেও সর্বাধিক রান করার রেকর্ডটি ধরে রেখেছিলেন. প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৭১টি ম্যাচে, ১১,১৬৭ রান, গড় ৪৮-এর বেশি, ৩০টি সেঞ্চুরির মালিক অমল ২০১৪ সালে ক্রিকেট থেকে অবসর নেন, শুরু করেন ক্রিকেট কোচিং. তারকা হয়েও জাতীয় দলে উপেক্ষিত থাকা অমল কোনও অভিযোগ ছাড়াই উপেক্ষা গ্রহণ করেছেন মর্যাদার সঙ্গে। তবে যন্ত্রণা কি তার ছিল না ? অবশ্যই ছিল. .

২০১৪ সালে অবসর নেওয়ার পর, অমল পাকাপাকি ভাবেই কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি প্রথমে ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলের তরুণ প্রতিভাদের নিয়ে কাজ শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে বাড়ে তাঁর অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ব্যাটিং কনসালট্যান্ট এবং আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের ব্যাটিং কোচ হিসাবে তিনি দায়িত্ব সামলান। খেলোয়াড়দের মানসিকতা বোঝার ক্ষমতা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর স্পষ্ট ভাবে যোগাযোগ করার দক্ষতা, ধীরে ধীরে তাঁকে করে তোলে একজন আদর্শ শিক্ষক। তাঁর শান্ত স্বভাব ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের প্রশংসা বারবার করেছেন করেছেন খেলোয়াড়রা। জটিল পরিস্থিতিকে সহজ করে দেওয়ার এক দুর্লভ ক্ষমতা রয়েছে অমল মজুমদারের মধ্যে. আসলে মন প্রাণ দিয়ে ক্রিকেটকে ভালোবাসতেন তো. তাই হাজার যন্ত্রণাতেও ময়দান ছাড়ার কথা ভাবতে পারেননি তিনি. শুধু নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার জন্য দাঁত চেপে লড়াই করে গেছেন. কথাতেই আছে যারা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যান না, জীবন তাদের ফেরায় না কখনও.

২০২৩ সালের অক্টোবরে BCCI অমল মজুমদারকে ভারতীয় মহিলা দলের প্রধান কোচ হিসেবে নিয়োগ করে। তবে তার আগে দীর্ঘ ১০ মাস কোচের পদ শূন্য ছিল না অমলের. অমল দায়িত্ব নেওয়ার আগের পাঁচ বছর ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট ছিল এলোমেলো, অস্থিরতায় ভরা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গোষ্ঠীদ্বন্ধ, দলাদলি ছিল ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটে নিত্যদিনের ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরেন অমল. আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ছাড়া কোচ ? প্রশ্ন উঠেছিল অমল দায়িত্ব নেওয়ার পরে. কিন্তু অমলের ধৈর্য্য, অনুশীলন হরমনপ্রীত, স্মৃতি, দীপ্তি, শেফালিদের পাল্টাতে থাকে. অমলের শিক্ষায় আরও শক্তিশালী, আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন হরমনপ্রীত, রিচারা. অমল তাঁর শিষ্যদের আস্থা অর্জন করেন. কারন ভাগ্য তখনই তাঁকে খোঁচা দিচ্ছিল। অমল ও তাঁর ছাত্রীদের মধ্যে সম্পর্ক শুধু একজন কোচ এবং ছাত্রীর সম্পর্ক ছিল না, ছিল একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর গভীর বন্ধন…ফাইট কোনি ফাইট…. অমলও তাঁর মেয়েদের বলতেন ফাইট ফাইট..

অমল মজুমদারের কোচিংয়েই ২ নভেম্বর ইতিহাল লিখল ভারতীয় মেয়েরা। তবে বিশ্বকাপের শুরুটা ভারতের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। ব্যাটিং বিপর্যয়, দিশাহীন বোলিং, ক্যাচ ফেলা সব মিলিয়ে ছন্দহীন দশা শেফালিদের. ঠিক তখনই অমলের ছোট্ট টিপসই বদলে দেয় হরমনপ্রীতদের। তিনি বকাবকি করেননি, বড় বক্তৃতাও দেননি। শুধু বলেছিলেন, ‘আমরা যদি শেষটা ভালো করি, সেটাই হবে আমাদের পরিচয়।

যারা আজও ভাবেন মেয়েদের রাতে বাইরে বেরোতে নেই. যারা ভাবেন মেয়েদের রান্না করা, সন্তান মানুষ করার বাইরে অন্য কোনও কাজ নেই, তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে রিচা, হরমনপ্রীত, শেফালিরা. অমল মজুমদারকে একসময় নতুন টেন্ডুলকার হিসাবে ভাবা হত. আসলে প্রতিটা সাফল্যের পিছনে ব্যর্থতা থাকে, কিন্তু সাফল্যের দিনে সকলে শুভেচ্ছা জানালেও ব্যর্থতার দিনে দাঁড়িয়ে সাহস দেওয়ার মানুষ হাতে গোনা. নিজেকে নিজেই সাহস দিয়ে জাপটে ধরেছিলেন অমল. উঠে দাঁড়িয়েছিলেন ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে. ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিসিসিআই ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের কোচ হিসাবে তাকে নির্বাচিত করার পরে, চোখের জল হাত দিয়ে মুছে, মানুযটা নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এবার সময় এসেছে সেটাই করে দেখানোর. যেটা কোনও দিনও হওয়ার ছিল না. অমল মজুমদার স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই রূপোর মেডেলকে সোনার মেডেলে পরিনত করার.

ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর পর, দ্রোণাচার্য অমল দাঁড়িয়ে ছিলেন সাইডলাইনে. হাত গুটানো, চোখে জল। মনে হচ্ছিল গুরুদক্ষিণা পেয়ে তৃপ্ত তিনি. তার চোখের জল জানান দিচ্ছিল তাঁর রাস্তা ভুল ছিল না. রাস্তা বন্ধুর হলেও তিনি দিশাহীন হয়ে যাননি. অমলের কাছে এটা শুধু ট্রফির লডাই ছিল না, ছিল ন্যায়বিচারের লড়াই। যে মানুষটি ২০ বছর ধরে হাজার হাজার রান করেও ভারতের হয়ে খেলতে পারেননি, তাঁর জন্য এটা ছিল নীরব প্রতিবাদ। তাঁর অধীনে ভারতীয় মহিলা দল শুধু জয়লাভ করেনি, বিশ্বাস করতে শিখেছে। আর অমল ২ নভেম্বর মাঠে নামার আগে তার মেয়েদের বলেছিলেন, ‘মর জায়ঙ্গে পার হারকে নেহি আয়েঙ্গে’… প্রমাণ করলেন স্বপ্ন কখনও মরে না শুধু রূপ বদলায়…