বিশ্বকাপের মূল পর্বে দেড় লক্ষের দেশ ‘কুরাসাও’

বারমুডাকে সাত গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের দরজা খুলে গিয়েছিল কুরাসাওয়ের। শেষ ম্যাচে জামাইকার সঙ্গে ড্র করে বিশ্বকাপের মূল পর্বে প্রবেশ করল কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের কুরাসাও।

ঋক পুরকায়স্থ, সাংবাদিক: ব্রিগেডের মাঠে বামেদের সমাবেশ, ধর্মতলায় শহিদ দিবসে তৃণমূলের শহিদ সমাবেশ বা প্রধানমন্ত্রীর কোন সভা। এসবতো আপনারা হামেশাই দেখেছেন। ব্রিগেডের মাঠে বা তৃণমূল-বিজেপির কোন সমাবেশে কত ভিড় হয় বলে মনে হয়? ৩ লক্ষ, ৪ লক্ষ বা ৫ লক্ষ। তবে কোনও দিনও ভেবে দেখেছেন যে এর থেকেও কম জনসংখ্যার কোনও দেশ ফুটবল বিশ্বকাপ খেলবে?

আজ এমন একটি দেশের কথা বলব যার জনসংখ্যা ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ১১৫ জন। অর্থাৎ ইডেন গার্ডেন্সে কোন ম্যাচ হলে সেখানের যা দর্শক সংখ্যা তার থেকেও কম। আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ কলকাতার মোট আয়তনের দ্বিগুণ। ২০১০ সালে ফিফার সদস্যপদ নিয়ে ২০২৬ এ বিশ্বকাপ খেলবে সেই দেশ। ভাবছেন যে কোন দেশের কথা বলছি?

কুরাসাও। নাম শুনেছেন কোনোদিন? পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর একটি দেশ। সমুদ্রে ঘেরা ছবির মতো দেখতে প্রায় দেড় লক্ষ জনসংখ্যার একটি দেশ বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে। এরআগে ২০১৮ সালে জনসংখ্যার বিচারে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসাবে বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড গড়েছিল আইসল্যান্ড। তখন তাদের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ। এবার সেই রেকর্ডও ভেঙে দিল কুরাসাও। বিশ্বকাপ খেলা সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসাবে এখন গোটা বিশ্বের কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দুতে কুরাসাও। এই দেশের কোনও প্লেয়ারই সেই দেশে জন্মগ্রহণ করেননি। সব প্লেয়ারই বিদেশি বংশোদ্ভূত। ফুটবল বিশ্বকাপে এটাও প্রথম।

বহু বছর নেদারল্যান্ডসের অধীন ছিল কুরাসাও। ২০১০ সালে তারা দেশের মর্যাদা পেলেও এখনও তারা ডাচ সার্বভৌমের অধীনে। ফলে এর আগে নেদারল্যান্ডসের অধীনে থাকায় দেশের সব নাগরীকদেরই নেদারল্যান্ডসের পাসপোর্ট আছে। আর এই সুযাগটাকেই কাজে লাগিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের প্রাক্তন কোচ ও কুরাসাও-এর বর্তমান কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ২০২৪ সালে কুরাসাও-এর কোচিংয়ের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। দায়িত্ব নিয়েই ডাচ বংশোদ্ভুত নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণ করা ২৪ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে আসেন কুরাসাওয়ে। যাদের সকলের বয়স ২৩ থেকে ২৬ এর মধ্যে। এরা সকলেই একসময় নেদারল্যান্ডের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তারকার ভিড়ে তাদের সেই স্বপ্ন সার্থক হয়নি। এই সমস্ত খেলোয়াড়দের নিয়ে তৈরি হয়েছে কুরাসাও জাতীয় ফুটবল দল।

কনকাকাফের অন্তর্গত একটি দেশ এই কুরাসাও। কনকাকাফের অর্থ হল কনফেডারেশন অফ নর্থ, সেন্ট্রাল আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল। এই কনকাকাফের মধ্য থেকে ছটি গ্রুপে ৫টি করে দেশ মোট ৩০ টি দেশ আন্তর্জাতিক যোগ্যতা অর্জন পর্বে অংশ নেয়। এই ৩০টি দেশের মধ্যেই একটি দেশ হল কুরাসাও। বারমুডাকে সাত গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের দরজা খুলে গিয়েছিল কুরাসাওয়ের। শেষ ম্যাচে জামাইকার সঙ্গে ড্র করাই যথেষ্ট ছিল তাদের জন্য। বুধবার ড্র করেই বিশ্বকাপের মূল পর্বে প্রবেশ করে কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের কুরাসাও।

ফিফা ব়্যাঙ্কিয়ে ১৩৬ নম্বরে থাকা ভারতও এতবছরে বিশ্বকাপের মূলপর্বে পৌঁছাতে পারল না। ১৪০ কোটির দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা কেন করছি? ২০১৯ সালে থাইল্যান্ডে আয়োজিত হয়েছিল কিংস কাপ। সেখানের ভারত প্রথমবার মুখোমুখি হয় কুরাসাওয়ের। তখন ভারতের কোচ ছিলেন ইগর স্চিমাচ। ভারতের প্রথম একাদশে ছিলেন তিন জন বঙ্গসন্তান প্রীতম কোটাল, শুভাশিস বসু ও প্রণয় হালদার। সেই ম্যাচে ৩-১ গোলে কুরাসাওয়ের কাছে হেরে যায় ভারত। একটি গোল পেনাল্টি থেকে করেছিলেন সুনীল ছেত্রী। তখন বলা হয়েছিল, যে দেশের নামই কেউ শোনেনি তার কাছে হেরে গেল ভারত। এরপর থাইল্যান্ডকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল ভারত। ও ভিয়েতনামকে ট্রাইবেকারে হারিয়ে কিংস কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল কুরাসাও। এটিই ছিল কুরাসাওয়ের প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি। খালিদ জামিলের প্রশিক্ষণে যখন ভারতকে বাংলাদেশের কাছে হারতে হচ্ছে তখন দেড় লক্ষ জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও বিশ্বকাপ খেলবে। অনেকের মতে ২০১৯ সালে কুরাসাওয়ের কাছে হারের পর থেকেই ভারতীয় ফুটবলের অধঃপতন শুরু হয়ে যায়।