কপিল মুনির মন্দিরের কাহিনি বলবে ৪০০ ড্রোন। ২০২৫-এর গঙ্গাসাগর মেলায় নজিরবিহীন উদ্যোগ!

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা, গঙ্গাসাগর : কথায় আছে, ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’। সেই গঙ্গাসাগর মেলার ইতিহাসে এবার যোগ হতে চলেছে এক নতুন এবং অভূতপূর্ব অধ্যায়। পুণ্যার্থীদের আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাকে একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে জেলা প্রশাসন এবার এক নজিরবিহীন ড্রোন শোয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কপিল মুনির মন্দিরের পাশে রাতের আকাশে ৪০০ থেকে ৫০০ ড্রোন ব্যবহার করে দেখানো হবে। সেই মহাজাগতিক প্রদর্শনী, যা গঙ্গাসাগর মেলা এবং কপিল মুনির মন্দিরের বিবর্তনের কাহিনি তুলে ধরবে। জেলা প্রশাসনের সূত্র অনুযায়ী, গঙ্গাসাগর মেলায় আসা তীর্থযাত্রীদের কাছে শুধু পুণ্যস্নান নয়, বরং মন্দির প্রাঙ্গনের পরিবেশ এবং ইতিহাসকেও বিশেষভাবে উপভোগ্য করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে প্রায় পাঁচ মিনিটের একটি জমকালো ড্রোন শো। জানা গিয়েছে, এই প্রদর্শনীতে কপিল মুনির মন্দিরের প্রতিষ্ঠা, সগররাজার কাহিনি, গঙ্গা দেবীর মর্ত্যে আগমন এবং গঙ্গাসাগর মেলার কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসের গল্প – সমস্তকিছুই তুলে ধরা হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই উচ্চ পর্যায়ের প্রশাসনিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রাথমিক সম্মতিও মিলেছে। প্রশাসনিক কর্তারা মনে করছেন, এই ড্রোন শো কেবল বিনোদন নয়, বরং ধর্মীয় স্থানটির মাহাত্ম্যকে এক ভিন্ন মাত্রায় তুলে ধরতে সক্ষম হবে, যা দেশ-বিদেশের পুণ্যার্থীদের জন্য এক বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করবে। একটি শো শেষ হওয়ার অল্প কিছুক্ষণের বিরতির পর, আবার তা চালু করা হবে, যাতে ভিড়ের চাপ সামলে প্রত্যেকেই এই অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে। বর্তমানে এই শো-এর বিষয়বস্তুর বিস্তারিত বিবরণ তৈরির কাজ জোরকদমে চলছে।
ঐতিহ্যগতভাবে, প্রতিবছরই জেলা প্রশাসন মেলার জন্য কিছু না কিছু নতুন আকর্ষণ নিয়ে আসে। বিগত বছরগুলিতে কখনও বাংলার বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানের রেপ্লিকা, আবার কখনও তীর্থযাত্রীদের জন্য বিশেষ শুভেচ্ছা বার্তা প্রদর্শিত হয়েছে। তবে এবার প্রযুক্তির এই ধরনের বড় মাপের ব্যবহার গঙ্গাসাগরের ইতিহাসে প্রথম। একজন পদস্থ আধিকারিক জানান, “এর আগে কখনও গঙ্গাসাগরে এই ধরনের হাই-টেক প্রকল্প নেওয়া হয়নি। আমরা নিশ্চিত, এটি পুণ্যার্থীদের কাছে এক বিশাল চমক হবে।”
আগামী জানুয়ারির ৮ তারিখ থেকে শুরু হতে চলেছে এবারের গঙ্গাসাগর মেলা। তার আগেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলছে প্রস্তুতির কাজ। মঙ্গলবার ও বুধবার জেলাশাসক অরবিন্দ কুমার মিনা এবং সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে মেলার গ্রাউন্ডের কাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখেছেন। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কচুবেড়িয়া পয়েন্টের জেটিঘাটগুলিও পরিদর্শন করা হয়েছে।
প্রশাসনের তরফে এবারের মেলায় রেকর্ড সংখ্যক পুণ্যার্থীর আগমন আশা করা হচ্ছে। সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা জানান, গত বছর কুম্ভ মেলা থাকা সত্ত্বেও গঙ্গাসাগর মেলায় এক কোটি ১০ লক্ষ পুণ্যার্থীর ঢল নেমেছিল। এই বছর কুম্ভ মেলা না থাকায় সেই সংখ্যাটি দেড় কোটি ছুঁয়ে যেতে পারে বলে প্রশাসনিক আধিকারিকরা আশা করছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন সামাল দিতে প্রস্তুতিও চলছে জোর কদমে।

ইতিমধ্যে মুড়িগঙ্গা নদীতে চলছে ৩০ কোটি টাকা বাজেটে ড্রেজিং-এর কাজ, যা জলপথে ভেসেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে। এক থেকে ছয় নম্বর পর্যন্ত ভেঙে যাওয়া স্নানের ঘাটগুলি মাটি ফেলে মেরামত করা হচ্ছে। স্থলপথে গাড়ি পরিষেবা এবং পুণ্যার্থীদের সুবিধার জন্য ‘বাফার জোন’-এর পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। এই বছর গঙ্গাসাগর মেলায় সমস্ত ধরনের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় বাড়তি নজর দেওয়া হবে।
প্রতি বছরের মতো এবারও জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে আসার কথা রয়েছে। তার আগেই কপিল মুনির মন্দিরের কাহিনীকে আকাশের ক্যানভাসে জীবন্ত করে তোলার এই অত্যাধুনিক ড্রোন শোয়ের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে এবারের মেলার প্রধান আকর্ষণ হতে চলেছে। ধর্মীয় আস্থাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন রূপে তুলে ধরার এই প্রয়াস গঙ্গাসাগর মেলার ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে আরও একবার তুলে ধরবে, এমনটাই আশা করছে প্রশাসন।