গঙ্গাসাগর মেলার আগে ২০ কোটির রাস্তা উদ্বোধন বঙ্কিমচন্দ্র হাজরার

​বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: প্রকৃতি ও মানুষের সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছর ১১ ডিসেম্বর উদ্‌যাপিত হয় ‘সুন্দরবন দিবস’। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্যকে রক্ষা ও সংরক্ষণের বার্তা দিতে এই বছর উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার ১৯টি ব্লকে কর্মসূচি আয়োজিত হয়েছে। এই বছর জেলার মূল অনুষ্ঠানটি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগর ব্লকে আয়োজিত হয়, যেখানে পরিবেশ সচেতনতার পাশাপাশি গ্রামীণ পরিকাঠামো ও স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একাধিক বড় পদক্ষেপ নেওয়া হলো। রাজ্যের সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা এই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই সাগর গ্রামীণ হাসপাতালের জন্য একটি নতুন অ্যাম্বুলেন্সের উদ্বোধন করেন এবং প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রাস্তার শুভ শিলান্যাস করেন। ​এদিনের অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয় এক সুবিশাল বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে। সাগর ব্লকের চৌরঙ্গী থেকে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা সুসজ্জিত শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। এই শোভাযাত্রাটি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বার্তা বহন করে রুদ্রনগর কৃষক বাজারের অনুষ্ঠান মঞ্চে এসে শেষ হয়।

​শোভাযাত্রা ও মূল অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সাগরের বিডিও (ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার) কানাইয়া কুমার রাও, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সাবিনা বিবি, সহ-সভাপতি স্বপন কুমার প্রধান, জেলা পরিষদের সদস্য সন্দীপ কুমার পাত্র সহ জেলার একাধিক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও জনপ্রতিনিধি। মন্ত্রী প্রদীপ জ্বালিয়ে, জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে এবং মা সারদা দেবীর ছবিতে মাল্যদান করে এই দিনের অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করেন। ​অনুষ্ঠানে রাজ্যের গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক বিশাল পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা ঘোষণা করেন যে, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় পথশ্রী-৪ প্রকল্পের অধীনে সাগর ব্লকের সকল অঞ্চলে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রাস্তার শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠান করা হচ্ছে।

​এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলার মাটি – বাংলার পথ, স্বনির্ভরতাই বাংলার শপথ।” তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের রাস্তার সার্বিক উন্নয়ন করতে ২০,০৩০ কিলোমিটার রাস্তার নির্মাণ, পুননির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই প্রকল্পগুলোর শুভ শিলান্যাস করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য সরকারের উদ্যোগে বাংলার প্রত্যেকটা অঞ্চলে রাস্তার সামগ্রিক উন্নয়ন করাই মা-মাটি-মানুষের সরকারের উন্নয়ন। এই নতুন রাস্তাগুলো সাগর ব্লকের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুগম করবে। ​সুন্দরবন দিবসের এই মঞ্চ থেকে স্থানীয় মানুষের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নত করার ক্ষেত্রেও এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণা এবং স্থানীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ প্রচেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তর থেকে সাগর ব্লকের জন্য একটি অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়েছে।

​অনুষ্ঠান মঞ্চে মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা ফিতা কেটে সেই নতুন অ্যাম্বুলেন্সটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং তা সাগর গ্রামীণ হাসপাতালের হাতে তুলে দেন। মন্ত্রী বলেন, “সাগর একটি দ্বীপ এলাকা। এখানে অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই প্রধান চ্যালেঞ্জ। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এই অ্যাম্বুলেন্সটি আসায় এখানকার মানুষ জরুরি অবস্থায় আরও দ্রুত এবং উন্নত পরিষেবা পাবেন।” ​অনুষ্ঠানে সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরা সুন্দরবনের মানুষ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সুন্দরবন কেবল একটি অরণ্য নয়, এটি আমাদের বাঁচিয়ে রাখার রক্ষাকবচ। এর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।” তিনি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, বনসুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার উপর জোর দেন।

​​সুন্দরবন দিবসকে কেন্দ্র করে এদিন সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। মন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র হাজরার হাত ধরে এদিন বেশ কিছু স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে সবুজ সাথী সাইকেল তুলে দেওয়া হয়। এছাড়াও, স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সাধারণ মানুষের হাতে একাধিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: কৃষকদের জন্য ধান ছাড়ানো মেশিন, পান চাষীদের জন্য এসি নেট এবং স্বনির্ভরতা বাড়াতে গরু ও ছাগল। ​​জেলার অন্যান্য ব্লকের মতো সাগর ব্লকের মূল মঞ্চেও আলোচনা সভা, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিশু-কিশোরদের জন্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। স্কুল ছাত্র-ছাত্রীরা গান, নাচ ও নাটিকার মাধ্যমে সুন্দরবনের গুরুত্ব ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলিও পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ প্রচার চালায়। সুন্দরবনের প্রকৃতি, মানুষ ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সম্মিলিত অঙ্গীকারে জেলাজুড়ে সার্থকভাবে উদ্‌যাপিত হয় সুন্দরবন দিবস, যেখানে পরিবেশ, স্বাস্থ্য এবং গ্রামীণ উন্নয়নের মেলবন্ধন ঘটল।