Bangladesh: আসলে কে এই ওসমান হাদি ? যাঁকে কেউ বলছেন প্রতিরোধের প্রতীক। কেউ আবার বলছেন উগ্র রাজনীতির ফল ?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : বাংলাদেশে আবার অশান্তির আগুন। ঢাকার রাজপথে স্লোগান- “আমিও হাদি হব”। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে জুলাই আন্দোলনের অন্যতম মুখ, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির। এক ছাত্রনেতার মৃত্যু কীভাবে গোটা দেশকে ফের অগ্নিগর্ভ করে তুলল?
বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ঢাকার রাজপথে বিস্ফোরক পরিস্থিতি। শাহবাগ, পল্টন, ধানমণ্ডি- দিকে দিকে বিক্ষোভ। স্লোগান উঠছে- “আমিও হাদি হব, গুলির মুখে কথা কইবো”। হাদির মৃত্যু যেন এক মুহূর্তে আবেগকে রাগে বদলে দিয়েছে।
১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় টোটোয় যাওয়ার সময় খুব কাছ থেকে গুলি করা হয় ওসমান হাদিকে। মাথায় গুলি লাগে। প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতাল। অবস্থা সংকটজনক হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয় তাঁকে। ১৮ ডিসেম্বর রাতে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে মৃত্যু হয় তার। কিন্তু প্রশ্ন একটাই- কে এই ওসমান হাদি, যাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ আবার অশান্ত?
১৯৯৩ সালের ৩০ জুন বরিশালে জন্ম ওসমান হাদির
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তিনি
বাবা ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক
মাদ্রাসায় পড়াশোনা, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়া
পেশায় শিক্ষক, এক সন্তানের পিতা
অতি সাধারণ জীবন- রাজনীতিতে পরিচিত মুখ ছিলেন না দীর্ঘদিন
সব বদলে যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে যে ছাত্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়- সেখানেই হঠাৎ সামনে চলে আসেন ওসমান হাদি। রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে মাঠে নামেন। ধারালো ভাষা, আপসহীন অবস্থান তাঁকে রাতারাতি পরিচিত মুখ করে তোলে। এই আন্দোলনের মাঝেই জন্ম নেয় ইনকিলাব মঞ্চ।
ইনকিলাব মঞ্চ- একটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম।দাবি-
আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ করতে হবে
জুলাই আন্দোলনের বিচার চাই
রাষ্ট্রীয় দমননীতির অবসান চাই
এই মঞ্চের মুখপাত্র ও প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন হাদি
কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে বিতর্ক। গ্রেটার বাংলাদেশের মানচিত্র প্রকাশ- যেখানে ভারতের সেভেন সিস্টার্স-সহ একাধিক অঞ্চলকে বাংলাদেশের অংশ দেখানো হয়। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙচুরে সক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ। ভারত-বিরোধী বক্তব্যে ক্রমশ কট্টর হয়ে ওঠে ইনকিলাব মঞ্চের রাজনীতি। সমর্থকদের কাছে তিনি নির্ভীক, সমালোচকদের চোখে বিপজ্জনক উস্কানিদাতা। মৃত্যুর আগেই আশঙ্কা করেছিলেন হাদি। গত নভেম্বরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় হাদি দাবি করেছিলেন- তাঁকে খুনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবু পিছিয়ে যাননি। তিনি ঘোষণা করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন। “চা-সিঙারা” আড্ডায় শুরু হয় প্রচার। এরপর হাদির মৃত্যুর পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
ঢাকায় হামলা চলে ভারতীয় দূতাবাস, ছায়ানট, আওয়ামি লিগ অফিসে
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের অফিসে হামলার অভিযোগ
চট্টগ্রামে এক সাংবাদিক খুন
ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু যুবককে পিটিয়ে হত্যা
বাংলাদেশ কার্যত অগ্নিগর্ভ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। শোকপ্রকাশ, সংযমের আহ্বান। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস। সরকারের দাবি- আওয়ামি লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগের কর্মী এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- এক ছাত্রনেতার এত দ্রুত উত্থান কীভাবে সম্ভব হলো? কারা তাঁকে সামনে এনেছিল? ভারত-বিরোধিতা আর উগ্র রাজনীতির আড়ালে কি বড় কোনও শক্তির খেলা ছিল? পাকিস্তানি প্রভাবের অভিযোগও উঠছে রাজনৈতিক মহলে। ওসমান হাদির জীবন সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রভাব গভীর।
সমর্থকদের কাছে তিনি শহিদ, সমালোচকদের কাছে অস্থির রাজনীতির ফল। তবে একথা নিশ্চিত- ওসমান হাদির মৃত্যু বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি, তরুণ নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল।