আদালতের নির্দেশে ধীরে ধীরে সিলমুক্ত হচ্ছে ফাইল। আর তাতেই বেরোচ্ছে বহু নাম। যেখানে ছিল সহকারী, বন্ধু, দালাল এবং তার সহযোগীরা। সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম- ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ভয়ঙ্কর এক নাম- জেফ্রি এপস্টিন। যিনি একজন কোটিপতি আবার একাধারে একজন যৌন অপরাধী। আর এমন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যার চারপাশে ঘুরেছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মুখগুলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, বিলিয়নেয়ার শিল্পপতি থেকে হলিউডের তারকা, রাজনীতিবিদ, রাজপরিবার- সবাই কোনও না কোনও ভাবে জড়িয়ে পড়েছেন এই নামের সঙ্গে। আজ, সেই এপস্টিন ফাইল ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে। আর তার সঙ্গেই উঠছে একটাই প্রশ্ন- কে জানত, কে চুপ ছিল, আর কে দায় এড়াল?
কে ছিলেন জেফ্রি এপস্টিন?
জেফ্রি এপস্টিন- নিউ ইয়র্কে বেড়ে ওঠা এক অর্থদাতা, যিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন একজন দানশীল ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে।
১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে
ফ্লোরিডা, নিউ ইয়র্ক, নিউ মেক্সিকো
এবং তার ব্যক্তিগত ক্যারিবিয়ান দ্বীপে
নাবালিকাদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে
২০০৫ সালে প্রথম গ্রেফতার
২০০৮ সালে বিতর্কিত প্লি ডিল
মাত্র ১৩ মাসের সাজা, তাও বিশেষ সুবিধাসহ
এই শাস্তিই যেন তাকে আরও সাহসী করে তোলে।
অপরাধের নেটওয়ার্ক
এপস্টিন একা ছিলেন না। তার চারপাশে তৈরি হয়েছিল একটি নেটওয়ার্ক- যেখানে ছিল সহকারী, বন্ধু, দালাল এবং তার সহযোগীরা। সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম- ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ম্যাক্সওয়েলই নাবালিকাদের বেছে আনতেন, বিশ্বাস অর্জন করতেন, তারপর ঠেলে দিতেন এপস্টিনের ঘরে। আজ তিনি ২০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত বন্দি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- তিনি কি একাই ছিলেন?
২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কে ফের গ্রেফতার হন এপস্টিন
অভিযোগ- যৌন পাচার
কিন্তু বিচার শুরুর আগেই
ম্যানহাটনের জেল সেলে রহস্যজনক মৃত্যু
সরকারি ভাষায়- আত্মহত্যা
এরপরই জনমনে জন্মায় সন্দেহ
কারণ, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যায় বহু মুখ খোলার রাস্তা। এপস্টিন ফাইল মানে শুধু একগুচ্ছ নথি নয়। এটি প্রায় ৩ লক্ষ পৃষ্ঠার রেকর্ড, ৯৫ হাজারের বেশি ছবি, হাজার হাজার ইমেইল, ভিডিও ও সাক্ষ্য। এই নথিগুলো মূলত এসেছে- ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া গিফ্রের মামলার সূত্রে। আদালতের নির্দেশে ধীরে ধীরে সিলমুক্ত হচ্ছে ফাইল। আর তাতেই বেরোচ্ছে বহু নাম। প্রথমে ১৯টি ছবি প্রকাশ করা হয়। তার পরে আরও প্রায় ৮০টি ছবি প্রকাশ্যে আসে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০টি ছবি প্রকাশ করেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। তার মধ্যে বেশ কিছু ছবি আগেও প্রকাশ্যে এসেছে। প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে-
ডোনাল্ড ট্রাম্প
বিল ক্লিনটন
স্টিভ ব্যানন
বিল গেটস
রিচার্ড ব্র্যানসন
ল্যারি সামার্স
উডি অ্যালেন
প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে

যে সব ছবি প্রকাশ্যে আনা হয়েছে তার মধ্যে একটিতে তরুণ বিল ক্লিন্টনকে হট টাবে আয়েশ করতে দেখা যাচ্ছে। তবে ছবির একটা অংশ কালো আয়তাকার অংশে ঢাকা। আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক মহিলার সঙ্গে সাঁতার কাটছেন ক্লিন্টন। মনে করা হচ্ছে ওই মহিলা এপস্টেইনের প্রেমিকা ম্যাক্সওয়েল। আরেকটি ছবিতে ক্লিন্টনের সঙ্গে দেখা গিয়েছে কিংবদন্তি পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনকেও। তাঁদের পাশেই রয়েছেন গায়িকা ডায়না রস। তবে প্রকাশিত ছবি ও তথ্যে ট্রাম্পের প্রায়-অনুপস্থিতির দিকটিও ভাবাচ্ছে ওয়াকিবহাল মহলকে। গত শতকের নয়ের দশক ও নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকে এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতার কথা বারবারই সামনে এসেছে। কিন্তু নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত ফাইলে একটিও ছবিতে তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। উল্লেখও নিতান্তই সামান্য। একমাত্র একটি যোগাযোগের খাতায় ট্রাম্পের নাম রয়েছে। খাতাটি কার, সেটাও পরিষ্কার নয়। অথচ এর আগে প্রকাশিত নথিতে ট্রাম্প ছিলেন। এমনকী, এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এবার ট্রাম্পের অনুপস্থিতিতে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে নিজেকে বাঁচাতেই সম্ভবত বিল ক্লিন্টনকে এগিয়ে দিতে চাইছেন বর্ষীয়ান রিপাবলিক নেতা। মাসখানেক আগেই জানা গিয়েছিল, এপস্টেইনের সঙ্গে ক্লিন্টনের কী সম্পর্ক ছিল তা নিয়ে তদন্তের আর্জি জানিয়েছেন ট্রাম্প এবং সেই তদন্ত শুরুও হয়েছে।
কমিটি স্পষ্ট বলেছে- এই ছবিগুলো অপরাধের প্রমাণ নয়। কিন্তু এগুলো প্রমাণ করে- এপস্টিন কতটা গভীরে ঢুকে পড়েছিল ক্ষমতার অন্দরমহলে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ- হোয়াইট হাউস ইচ্ছাকৃতভাবে সব তথ্য প্রকাশ করছে না। রিপাবলিকানদের পাল্টা দাবি- ডেমোক্র্যাটরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছবি ছাড়ছে। এই দড়ি টানাটানির মাঝেই ভুক্তভোগীরা অপেক্ষায়- ন্যায়বিচারের। ফাঁস হওয়া ইমেল অনুযায়ী, এপস্টিন ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদী ও স্টিভ ব্যাননের মধ্যে বৈঠক করাতে চেয়েছিলেন। ভারত-ইজরায়েল সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য, ভারতীয় শিল্পপতিদের সঙ্গেও যোগাযোগের তথ্য রয়েছে। যদিও কোথাও অপরাধের প্রমাণ নেই, তবু প্রশ্ন উঠছে- একজন দণ্ডিত অপরাধী এত প্রভাব পেল কীভাবে? এপস্টিন ফাইল আসলে এক আয়না। যেখানে দেখা যায়- ক্ষমতা থাকলে অপরাধ কত সহজে ঢাকা পড়ে, নীরবতা কীভাবে অপরাধকে বাঁচায়। এই ফাইল কোনও একজনকে দোষী প্রমাণের দলিল নয়, বরং একটি ব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল। প্রশ্ন একটাই- সব সত্য কি কখনও প্রকাশ পাবে? নাকি কিছু নাম চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যাবে? এপস্টিন চলে গেছেন। কিন্তু প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে।