কীভাবে ছোট দেশগুলিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করছে বিশৃঙ্খলার সওদাগররা ? কীভাবে প্রক্সি যুদ্ধের নীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া ?

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : বিশ্ব রাজনীতির বিশাল মঞ্চে চিত্রনাট্যটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুই সর্বশক্তিমান দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া মঞ্চের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্বের উপর দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে দেখুন। আলো আসলে কোথায় ফেলা হচ্ছে। ওয়াশিংটন বা মস্কোর উপর নয় বরং ইউক্রেনের ক্ষতবিক্ষত ভূখণ্ড, আফ্রিকার সাহেলের ক্ষত বিক্ষত রাষ্ট্রগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত হয়ে ওঠা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলির উপর।
জণগনের সামনে যা তুলে ধরা হয় তা হল গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্র, পশ্চিম বনাম পূর্বের মতাদর্শের লড়াই। কিন্তু এর আড়ালে বাস্তবটা একেবারেই ভিন্ন। ছোট দেশগুলি এই বড় দেশগুলির অংশীদার মোটেও নয়। ছোট দেশগুলি হল গ্রাহক এবং পরীক্ষাক্ষেত্র। বিশ্বজুড়ে যে যুদ্ধের পরিবেশ চলছে, তা কেবল কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি সফল ব্যবসায়িক মডেল।

অস্থিরতার অর্থনীতি
২০২৬ সালেও কেন শান্তি অধরা ? তা বুঝতে হলে আর্থিক গতিকে অনুসরণ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়েরই প্রতিরক্ষা শিল্প হল তাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। যাদের ক্রমাগত পুষ্টি জোগাতে হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মডেল- বিশ্বের অস্ত্র বাজারে আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছে। যা মোট রফতানির ৪০ শতাংশের বেশি। পূর্ব ইউরোপ বা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যখন উত্তেজনা বাড়ে, তখন লকহিড মার্টিন এবং রেথিয়নের মতো বড় সংস্থাগুলোর শেয়ারের দাম ব্যাপক বেড়ে যায়। প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে প্রায়শই নিরাপত্তার আড়ালে ছোট দেশগুলো যেমন তাইওয়ান, পোল্যান্ড, বাল্টিকের মতো দেশগুলোর কাছে বিলিয়ন ডলারের উন্নত অস্ত্র বিক্রি করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা হচ্ছে আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু আসলে দেশগুলোকে সামরিকীকরণের একটি চক্রে আবদ্ধ করা হচ্ছে। এইধরণের প্রতিরক্ষা বিল পাশ করিয়ে আসলে সামাজিক উন্নয়নকে পিছনের সারিতে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।
রুশ মডেল- নিষেধাজ্ঞার শিকার ও বিচ্ছিন্ন হয়ে মস্কো এক অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেছে। স্বৈরশাসকের অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে। মালি, বুরকিনা ফাসো এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের মতো দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা প্যাকেজ সরবরাহ করে রুশ বেসরকারি সামরিক ঠিকাদার এবং রাষ্ট্রীয় রফতানিকারকরা। এর বিনিময়ে তারা সোনা, হিরে এবং বিশ্ব রাজনৈতিক আনুগত্য আদায় করে নেয়। তারা শুধু অস্ত্রই বিক্রি করে না। শাসনব্যবস্থায় টিকে থাকার বিষয়টাও নিশ্চিত করে। বিশ্বজুড়ে সংঘাতকে এতটাই সক্রিয় করে দেয় যে, তাদের মক্কেল তাদের উপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ছোট, দুর্বল দেশগুলোর দুর্ভাগ্য হল তাদের খুব কমই নিজেদের শর্তে জয়ী বা পরাজিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। যখন কোনও ছোট দেশ গৃহযুদ্ধ বা আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন একটি পক্ষকে বেছে নেয় শক্তিমান দেশগুলি। পশ্চিমী দেশগুলি থেকে জ্যাভলিন এবং পূর্বের দেশগুলি থেকে রাইফেল ও কামান জাতীয় অস্ত্রশস্ত্রে ভরিয়ে নিশ্চিত করার পর যুদ্ধ বছরের পর বছর চলতে থাকে। সিরিয়া দিয়ে ব্লু প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল। তারপর ইউক্রেন হল বর্তমান সংস্করণ। এর লক্ষ্য দ্রুত বিজয় পাওয়া নয়। প্রায়শই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিমান দেশের রক্তক্ষরণ করা হয়। সেই রক্ত সরবরাহ করে ছোট দেশ।

ব্যবহার করুন নাহলেই হাতছাড়া!
উন্নত অস্ত্রশস্ত্র একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বৈধ থাকে। পাশাপাশি অস্ত্রগুলি পরিচালনার জন্যও একটি চুক্তি করতে হয়। পরবর্তী প্রজন্মের ফাইটার জেট বা মিসাইলের যৌক্তিকতা প্রমাণ করার জন্য পুরনো মজুদ করা অস্ত্র অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। ছোট আকারের সীমান্ত সংঘর্ষগুলিতে সরাসরি গোলাগুলি ছোড়া হয়। যা বিপনন প্রদর্শনী হিসেবে সারা বিশ্বকে দেখানো হয়।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের ক্ষয়
সামরিক সরঞ্জামের উপর মার্কিন বা রুশ ঋণে জর্জরিত একটি ছোট দেশ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নয়। এদের বিদেশনীতি নির্ধারণ করে ওই শক্তিমান দেশের অস্ত্রের সরবরাহকারীরা। রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদেও প্রায়শই চুক্তির বিনিময়ে ভোট কেনাবেচা হয়।
স্থানীয় সংঘাতগুলিকে বড় যুদ্ধে পরিণত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া কার্যকরভাবে ছোট দেশগুলোর স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নেয়। আফ্রিকার একটি সীমান্তবিরোধী নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ শুরু হয়। যার ফলে আসে ভাড়াটে সেনা, বিদেশি গোয়েন্দা, ভারী অস্ত্রশস্ত্র। যা স্থানীয় জনগণ মোটেও চায়নি।
কীভাবে এই সামরিক চক্র ভাঙা যায়
বিশ্ব আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এই কারণে নয় যে ছোট দেশগুলো সহিংস হয়ে উঠছে। বরং এই কারণে যে, বড় দেশগুলো তাদের সহিংসতা থেকে লাভবান হয়। যতক্ষণ বিশ্বের নিরাপত্তা কাঠামো শান্তিরক্ষকের পরিবর্তে অস্ত্র বিক্রেতা ঠিক করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি বিলাসবহুল হয়েই থাকবে। যা দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে বহন করাটা কষ্টসাধ্য হবে।
সময় এসেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যারা গ্লোবাল সাউথের দ্বারা চালিত নয়, তাদের একটা নতুন কাঠামোর দাবি জানাতে হবে। এমন একটি কাঠামো যা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের বাইরে থেকে অস্ত্র সরবরাহের জন্য শাস্তি দেবে এবং সামরিক সাহায্য চেয়ে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকে অগ্রাধিকার দেবে। ততদিন পর্যন্ত ছোট দেশগুলি একটি প্রাণঘাতী খেলায় মেতে উঠবে। যেখানে তারা লাশ ফেলবে এবং শক্তিমান দেশগুলি সেই লাশ গুণবে।