এক শ্বেতপত্রে চিন সরাসরি মেরিল্যান্ডের মার্কিন সামরিক গবেষণাগার ফোর্ট ডেট্রিকের জৈব-সামরিক কার্যকলাপ এবং নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার দিকে আঙুল তুলেছে।

জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: কোভিড ১৯ এর উৎস নিয়ে চিন এবং আমেরিকার মধ্যে দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক বিতর্ক দেখা যায়। চিন তার অবস্থান স্পষ্ট করতে এবং আমেরিকার অভিযোগের পাল্টা জবাব দিতে বিভিন্ন সময়ে শ্বেত পত্র প্রকাশ করেছে। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল কোভিড ১৯ প্রতিরোধ এবং ভাইরাসের উৎস নিয়ে চিন তার সর্বশেষ শ্বেত পত্র প্রকাশ করে। সেই শ্বেতপত্রে চিন পরিস্কার ভাবে অস্বীকার করে জানিয়েছে, চিনের উহান নয়, সার্স কোভ ২- উৎপত্তি হতে পারে আমেরিকায়। এবং ওই শ্বেতপত্রে চিন সরাসরি মেরিল্যান্ডের মার্কিন সামরিক গবেষনাগার ফোর্ট ডেট্রিকের জৈব-সামরিক কার্যকলাপ এবং নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার দিকে আঙুল তুলেছে। চিন ওই শ্বেতপত্রে দাবি করেছে, ভাইরাসের উৎস সন্ধানে এখন আমেরিকার উপর তদন্ত হওয়া উচিত। ফলে কোভিড অতিমারির ছয় বছর পরে সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের উৎস অনুসন্ধান বৈজ্ঞানিক তদন্ত থেকে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের অস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এই বিতর্কটি কেবল এখন আর বিজ্ঞানীদের মধ্যে সীমাবন্ধ নেই। একটি বড় ধরনের ব্লেম গেম বা একে অপরকে দোষারোপের খেলায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ট্যাঙ্ক, মিসাইল নয় পেনের খোঁচায় যে যুদ্ধ সম্ভব সেটাও আরও একবার তৃতীয় বিশ্বের সামনে পরিষ্কার।

চিন এবং আমেরিকার মধ্যকার এই রাজনীতি এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের দিকগুলি হল-
চিন তার অবস্থান পরিষ্কার করতে, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে ল্যাব লিক তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করে জানায়, উহানের গবেষণাগার থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার দাবিটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। এবং আমেরিকার দিকে অভিযোগ তুলে চিন জানায়, ২০২৯ সালের জুলাই মাসেই আমেরিকার উত্তর ভার্জিনিয়ায় এবং ফ্লোরিডায় রহস্যময় নিউমোনিয়া দেখা গিয়েছিল, যা কোভিড ১৯ হতে পারে। ফলে ভাইরাসের উৎস সন্ধানে আমেরিকার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত। চিন মনে করছে, আমেরিকা নিজেদের মহামারী নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং চিনের উন্নয়নকে বাধা দিতে ভাইরাস নিয়ে রাজনীতি করছে।
তবে চুপ করে বসে নেই আমেরিকাও। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA জানায়, ভাইরাসটি গবেষণাগার থেকে লিক হওয়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। এবং চিন মহামারী শুরুর দিকে তথ্য গোপন করেছে। এবং তারা হু-এর তদন্তকারীদের উহানের ল্যাবে প্রবেশের অধিকার দেয়নি। মার্কিন কংগ্রেসের তদন্ত কমিটি দাবি করছে, উহান ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজিতে বিপদজনক ভাইরাসের জিনগত পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার সময় দুর্ঘটনাবসত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আমেরিকার বিরুদ্ধে চিনের সবথেকে বড় অভিযোগ হল- ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মেরিল্যান্ডের ফোর্ট ড্রিকের- ইউএস আর্মি মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ ইনফেকশান ডিজিজেস- হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া। আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেন্ট নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বন্ধ করা হয়েছিল। ফলে চিন প্রশ্ন তুলেছে, ওই ল্যাবে কি ধরনের গবেষণা চলছিল।
তবে কোভিড ১৯ এর উৎস কোথায়, সেটাকে কেবল ভাইরোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, রাজনৈতিক কৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। বিজ্ঞানীরা, হু -র নতুন রোগজীবাণুর উৎস সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা গোষ্ঠী বলছে,আরও বিস্তারিত তথ্য ছাডা় ল্যাব থেকে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর এই বিতর্ক থামানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য,উহানের প্রাথমিক রোগীর নমুনা, হুয়ানান বাজারের জেনেটিক সিকোয়েন্স এবং ল্যাব লগ—এখনও নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। তবে এটা ঠিক কোভিড এর উৎস সম্বন্ধে আমেরিকার কোর্টে বল ঠেলে বিষয়টিকে আরও ঘোলাটে করছে বেজিং।
আসলে কোভিড এর উৎস এমন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যা সোজা ভাষায় বিশ্লেষণ করলে বোঝায়, কার ব্যবস্থা বেশি ভালো এই নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। চিন তাদের শ্বেতপত্র প্রকাশের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চায়, তারা দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ। অন্য়দিকে আমেরিকার প্রমাণ করতে চায়, চিন একটি অগণতান্ত্রিক ও অস্বচ্ছ রাষ্ট্র। যারা বিশ্ববাসীর নিরাপত্তা বিপন্ন করে থাকে। তবে সব থেকে যেটা বড় কথা সেটি হল- এই কূটনৈতিক নাটকের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে পঙ্গু করে দেওয়া। আসলে হু দুটি বড়শক্তির মাঝে আটকা পড়েছে। এবং কোনও পক্ষের থেকেই সাহায্য পাচ্ছে না। ফলে নতুন করে কোনও অঞ্চলে যদি, নতুন ভাইরাসের জন্ম হয়, তবে সেই দেশটি কি রিপোর্ট করবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে? নাকি তারাও ভয় পেয়ে গোপন করবে। যে যদি তারা নতুন ভাইরাসের কথাটি জানায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তাহলে জৈব-অস্ত্র বা অবহেলার অভিযোগ আসতে পারে?
তবে দুই দেশ কোভিডের উৎস নিয়ে দায় ঠেলাঠেলি করলেও ২০২৬ -এর শুরুতে দেখা যাচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্ব বা শত্রুতার নয়। বরং দুই দেশের সম্পর্ক কেবল প্রতিদ্বন্দীতার। তবে মানবিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি কিন্তু দুই দেশের মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে মৃতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির ধরণ নিয়ে তথ্যের ক্ষেত্রে বড় ধরণের একটা পার্থক্য ও বিতর্ক রয়েছে। আমেরিকার সরকারি তথ্য অনুযায়ী সেদেশে মৃতের সংখ্যা সরকারি ভাবে দেখানো হয়েছে- ১১ লক্ষ ৫০ হাজার থেকে ১২ লক্ষের বেশি। আর চিনের অফিশিয়াল তথ্য বলছে, সেদেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের। চিনের দেওয়া অফিশিয়াল মৃতের সংখ্যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সন্দেহ রয়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা এবং অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলছেন, ২০২২ সালে জিরো কোভিড নীতি চিন তুলে নেওয়ার পরে, চিনে মৃতের সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কোভিড কিন্তু মৃতের সংখ্যার পাশাপাশি জন্ম দেয় অর্থনৈতিক মন্দাও। কোভিড পরবর্তী সময়ে আমেরিকায় বেকারত্বের হার ১৪.৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। যা কয়েক দশকে আমেরিকা দেখেনি। আর জিরো কোভিড নীতির কারনে চিনে ২০২২-২৩ সালে চিনের অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ যুদ্ধ আবহ। ভেনেজুয়েলা-গ্রীনল্যান্ড-ইরান-ইজরায়েলের উপর আমেরিকার ছড়ি ঘোরানো। ইউক্রেনের উপর রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা এই পরিস্থিতিতে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোভিড ১৯ এর উৎস নিয়ে দোষারোপের বিষয়টি সংবেদনশীল হলেও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এটি যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারন উভয় দেশই পারমাণবিক শক্তিধর। ফলে সরাসরি সামরিক সংঘাতের অর্থ পারমানবিক সংঘাতের ঝুঁকি। ফলে সরাসরি পারমানবিক সংঘাতে না জড়িয়ে সাইবার আক্রমণ, বাণিজ্য যুদ্ধ ও কূটনৈতিক চাপ বজায় রেখে একে অপরকে কোনঠাসা করতে উঠে পড়ে লেগেছে।
তবে এটা ঠিক সঠিক প্রমাণ ছাড়া আমেরিকার বিরুদ্ধে চিনের অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা কম। ঠিক যেমন একটি ল্যাব নোটবুকে নির্দিষ্ট ভাইরাসের পূর্বসূরীর “অকাট্য প্রমাণ” না থাকায় “উহান ল্যাব লিক” তত্ত্বটি অপ্রমাণিত রয়ে গেছে। কিন্তু জনগনের আদালতে ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। কোভিড-১৯-এর উৎস এখন তথ্যের চেয়ে বিশ্বাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটন এবং বেজিং তথ্যের পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভাইরাসের আসল ইতিহাস চাপা পড়ে থাকবে।