লক্ষ্মীর ঝাঁপি হল লক্ষ্মীর ভান্ডার

“স্ত্রীর জন্য স্বামীরা যা ভাবেন না, দিদি অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী তা ভেবেছেন ও করে দেখিয়েছেন। “

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : মহিলাই হলেন ঘরের চাবিকাঠি। তাঁরাই চালান সংসার। বাজারের হিসাব নিকাশ থেকে রান্নার মেনু। সবই থাকে তাঁর হাতে। তবে সেসব সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য কিছু করে ওঠা হয় না। বা বলা ভালো তেমন টাকা বাঁচানো হয় না আলাদা করে। এই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হন অনেকে। মহিলাদের কথা ভেবে লক্ষ্মীর ভান্ডারে আরও ৫০০ টাকা বাড়ানো হল

এই ভাতায় চলছে সংসার, ওষুধের খরচ আরও অনেককিছু। এক মহিলার তো দাবি স্ত্রীর জন্য স্বামীরা যা ভাবেন না, দিদি অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রী তা ভেবেছেন ও করে দেখিয়েছেন। এছাড়াও কেউ এই টাকা থেকে সন্তানের পড়াশোনা করাচ্ছেন। কেউ স্বামীর চিকিৎসা করাচ্ছেন।


১ ফেব্রুয়ারি। কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। সামনেই বাংলায় ভোট। তাই এই বাজেটের দিকে অনেক আশা নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন বঙ্গবাসী। ভেবেছিলেন বাংলার জন্য অনেক কিছু ঘোষণা হতে পারে এই বাজেটে। কিন্তু সেই আশায় পড়েছিল জল। কার্যত নিরাশ হতে হয়েছিল বাংলাকে। যা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে কম দায়ী করেনি রাজ্যের শাসক দল। তৃণমূলনেত্রী খুব ভালো করে জানেন জনতার মনের কথা। তিনি যে পোড় খাওয়া এক রাজনীতিবিদ। তাই বলা যায়, ঠিক কোন ফুলে কোন দেবতা তুষ্ট, তা ভালো মতোই জানা রয়েছে তৃণমূলনেত্রীর। তাই ঠিক ভোটের আগে রাজ্যবাসীর জন্য যেন কল্পতরু হয়ে গেলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য।

বলা বাহুল্য তৃণমূলের কাছে লক্ষ্মীর ঝাঁপি হল লক্ষ্মীর ভান্ডার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন ২০২১-এ তৃণমূল সরকারের বিপুল সাফল্যের পিছনে রয়েছে এই লক্ষ্মীর ভান্ডার। কারণ, ২১-এর ভোটের আগেই, তৃণমূল সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল এই লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প। আশা ছিল, গতবছর রাজ্য বাজেটে বাড়বে এই ভাতার পরিমাণ। কিন্তু রাজ্য সরকার গত বাজেটে এই ভাতার পরিমাণ অপরিবর্তিত রেখেছিল। ফের ভোটের মুখে, লক্ষ্মীর ভান্ডারে জোর। এই ঘোষণাকে বিরাট আকারে দেখছে রাজনৈতিক মহল। বর্তমানে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা এই প্রকল্পের আওতায় ১০০০ এবং তফশিলি, জনজাতির মহিলারা পান ১২০০টাকা। যে সব মহিলাদের লক্ষ্মীর ভান্ডার রয়েছে তাঁরা প্রতি মাসে বাড়তি ৫০০ টাকা করে পাবেন। অর্থাৎ, যাঁরা ১ হাজার টাকা করে ভাতা পান, তাঁরা এবার থেকে ১,৫০০ টাকা করে লক্ষ্মীর ভান্ডার। আর এসসি বা এসটি মহিলারা পাবেন ১ হাজার ৭০০ টাকা করে লক্ষ্মীর ভান্ডার। ২০২১ সালে শুরু হওয়া লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় সামাজিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে মহিলা ভোটারদের মন জয়ে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে সেই কথা রেখেছিলেন তৃণমূল নেত্রী। প্রথমে মাসে ৫০০ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছিল। গত লোকসভা ভোটের আগে এক ধাক্কায় তা বাড়ানো হয়েছিল। তার সুফলও পেয়েছিল রাজ্যের শাসকদল। মহিলা ভোটাররা দু-হাত উজাড় করে ঘাসফুলে ভোট দিয়েছিল। গত পাঁচ বছরে শুধুমাত্র এই প্রকল্পের মাধ্যমেই মহিলাদের হাতে ৭৪ হাজার কোটি নগদ টাকার জোগান দিয়েছে রাজ্য সরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে বরাদ্দ হয়েছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে ১ কোটি ৪১ লক্ষ মহিলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধা পান। বর্তমানে ২ কোটির বেশি মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসেন। ভোটের মুখে এই ভাতা বৃদ্ধিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাস্টারস্ট্রোক বলছেন। বর্তমানে রাজ্যে মোট সাড়ে ৭ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই এই প্রকল্পের সুবিধাভোগী। ফলে এই বিপুল সংখ্যক ভোটদাতার মন জয় করতে ভাতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। চলতি ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই লক্ষ্মীর ভান্ডার-এর বর্ধিত অর্থ কার্যকর করা হবে। অর্থাৎ, ভোটের আগেই প্রত্যেকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে বাড়তি টাকা ঢুকে যাবে। সরকারি এই প্রকল্পে এখনও পর্যন্ত গ্রাহকের সংখ্যা ২ কোটি ২১ লক্ষ। আরও ২০ লক্ষ ৬২ হাজার মহিলার আবেদন জমা পড়েছে। তাঁদের প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। নতুন, পুরনো সকলেই বর্ধিত অর্থ পাবেন। ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সি যে কোনও মহিলাই এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন। প্রকল্পের মেয়াদ ৬০ বছর পর্যন্ত। তবে ষাটোর্ধ্বেরা একই পরিমাণ অর্থ বার্ধক্য ভাতা হিসাবে পেয়ে থাকেন।

মানে এক কথায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ মহিলাদের একাংশ। কেউ কেউ তো বলেই দিলেন দিদির হাত তাঁরা ছাড়ছেন না। দিদি তাঁদের জন্য এতকিছু করেছেন। তাঁরা কোনওভাবেই দিদির পাশ থেকে সরছেন না। তাহলে কি এই বাজেটের পর আবারও বিপুল ভোটে জয়ী হতে চলেছে তৃণমূল ? এবার কি বিরোধীদের মুখ তুলে দাঁড়াতেই দেবে না ঘাসফুল শিবির ? মহিলাদের যা উচ্ছাস, যা খুশি, তা দেখে রাজনৈতিক কারবারিরা বলছেন, এই উচ্ছাসে কিছুটা ভয় পেতে শুরু করেছেন বিরোধীরা। তবে এই প্রভাব কতটা পড়তে চলেছে ভোট ব্যঙ্কে। তা উত্তর মিলবে ভোটের ফলাফলে।