সার্বভৌমত্ব বাজি রেখে বাণিজ্য চুক্তি!

ওয়াশিংটনে ৯ ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে। চুক্তির মূল ভিত্তি হল পারস্পরিক শুল্ক হার কমানো।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত হতে চলেছে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি। যা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। একদিকে এই চুক্তি দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) খাতকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে আবার নজিরবিহীন গোপনীয়তা ও নির্বাচনের ঠিক আগের সময়কে কেন্দ্র করে উঠছে তীব্র বিতর্ক।

চুক্তির মূল ভিত্তি হল পারস্পরিক শুল্ক হার কমানো। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যের উপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশের রফতানি খাতে ব্যাপক ধাক্কা লাগে। অগাস্টে তা কমে ২০ শতাংশে নামলেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য আরও ছাড় জরুরি ছিল। নতুন চুক্তিতে শুল্কহার প্রায় ১৫ শতাংশে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ১৫ শতাংশ কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার কৌশল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৮ শতাংশ শুল্কহার নিশ্চিত করেছে ভারত। ফলে বাংলাদেশের জন্য আরও কম শুল্ক নিশ্চিত করাটা ছিল কৌশলগত প্রয়োজন।

মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয় আরএমজি খাত। প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হয় এই খাত থেকেই। যেখানে বড় অংশই নারী। সুতরাং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারানো মানে অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় বড়সড় আঘাত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৫ শতাংশ শুল্কহারকে অনেকেই ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে দেখছেন।

তবে এই চুক্তির পথচলা শুরু হয়েছিল এক বছর আগে, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি স্বাক্ষরিত এক গোপনীয় চুক্তি দিয়ে। গত এক বছরে বাণিজ্য আলোচনার শর্ত নিয়ে শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ, এমনকি সাংসদরাও বিস্তারিত জানতে পারেননি। এই গোপনীয়তার সংস্কৃতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে অন্ধকারে রাখাটা কতটা যুক্তিযুক্ত?

সমালোচকদের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকার মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে নির্বাচনের আগে এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ভবিষ্যৎ সরকারের নীতিগত স্বাধীনতায় সীমা টানতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে,  চুক্তির অংশ হিসেবে কিছু কৌশলগত ছাড় আদায়ের চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে রয়েছে-

১. চিন থেকে আমদানি কমাতে হবে।

২. মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে।

৩. মার্কিন গাড়িকে স্থানীয় পরিদর্শন ছাড়াই প্রবেশাধিকার দিতে হবে।

৪.  কৃষিপণ্য বিশেষত গম ও সয়াবিন তেল বাজারে বিস্তৃত সুযোগ দিতে হবে এবং মার্কিন মানদণ্ডে বাধ্যতামূলক পণ্য সনদ গ্রহণ।

৯ ফেব্রুয়ারির স্বাক্ষরিত হবে চুক্তি। তাই কেবল শুল্কহারের সমন্বয় নয়। এটি এক সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস। মনে করা হচ্ছে, এই চুক্তি আগামী এক দশকের জন্য রফতানির ধারাবাহিকতাকে নিশ্চিত করবে।

নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষর দেশের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে দিয়েছে। বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্বের একাংশ বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে না তো ? নাকি এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তায় টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশলগত বজয়? উত্তর দেবে সময়।