স্মার্ট প্রযুক্তির যুগে সৃজনশীলতার নতুন সঙ্কট। ধ্বংসের মুখে খসড়া, কাটাকুটি। এর ফলে কী বিপত্তি ঘটতে পারে ?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল : অঙ্ক হোক বা ছবি আঁকা কিংবা গান হোক বা কবিতা। সবকিছুর মূলে থাকত খসড়া। একবার লেখা, তারপর ভুল হলেই কাটা। এই কাটাকুটি অর্থাৎ খসড়া লিখতে লিখতেই আসল চেহারা পেত মানুষের শিল্পকর্ম। কিন্তু বর্তমানে সেই খসড়া ধ্বংসের পথে। এই ধ্বংসের পিছনে রয়েছে এআই। একটি মাত্র বাক্য লিখলেই ছবি, কবিতা, সুর সমস্তটা হাজির হয়ে যাচ্ছে আমাদের হাতের সামনে। ‘প্রম্পট’ টাইপ করলেই যেন তৎক্ষণাৎ শিল্পকর্ম হাজির হয়ে যাচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। জেনারেটিভ এআই-সহ স্মার্ট প্রযুক্তি সৃষ্টিকে গণতান্ত্রিক করে ফেলেছে, সেবিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই সহজলভ্যতার আড়ালে মৃত্যু হচ্ছে খসড়ার। আর সৃজনশীলতার পুরনো সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে।
শতাব্দীর প্রাচীন সৃজনশীলতার পিছনে থাকতো ভুলভ্রান্তিতে ভরা স্কেচ। দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া কাগজ, শূন্য ক্যানভাসের সামনে দীর্ঘ চিন্তা। কিন্তু এআইয়ের যুগে এসবই যেন জীবাশ্ম হয়ে যাচ্ছে। সৃজনশীলচা মুহূর্তে হাজির হচ্ছে চোখের সামনে, তাও আবার একটি মাত্র প্রম্পটে। ভাবনা আউটসোর্স হচ্ছে অ্যালগরিদমে। এর ফলে আর নতুন শিল্পী তৈরি হবে না। তৈরি হবে শুধু ‘কিউরেটর’, যারা কেবলমাত্র বেছে নিতে জানে, কিন্তু তৈরি করতে জানে না?
সমস্যার মূলে রয়েছে ঘর্ষণের অভাব। স্মার্ট প্রযুক্তির লক্ষ্য হল ঘর্ষণহীনতা। অটো-কমপ্লিট বাক্য, অটো-টিউন কণ্ঠ, অটো-কারেক্ট কোড। শিক্ষাবিদ ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ঘর্ষণের ফলেই কোনওকিছু শেখে মানুষ। একটি শিশু যখন মানুষের হাত আঁকতে গিয়ে বারবার ভুল করে, তখনই তার মস্তিষ্কে গড়ে ওঠে দৃষ্টিকোণ, অ্যানাটমি ও সূক্ষ্ম মোটর কন্ট্রোলের জটিল স্নায়ুপথ। এআই যদি কয়েক সেকেন্ডে নিখুঁত হাত এঁকে দেয়, সেই স্নায়ুপথ আর তৈরি হয় না।
ফলে তৈরি হচ্ছে ‘স্কিল অ্যাট্রোফি’-র আশঙ্কা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো নিখুঁত রুচি তৈরি করবে। কোন ছবি ভাল, কোন সুর মানানসই—তা বুঝবে। কিন্তু নিজের হাতে নির্মাণের দক্ষতা হারাতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আমরা এমন সব পরিচালক হাতে পাবো, যারা নিজে ক্যামেরা ধরতে জানে না। এমন স্থপতি পাবো, যে নকশা আঁকতে পারে না। যা কার্যত ভয়ঙ্কর।
আরও একটি বিপদ হল ‘অ্যালগরিদমিক সমতলীকরণ’। স্মার্ট অ্যালগরিদম রয়েছে প্রশিক্ষিত অতীতের তথ্যভান্ডারেই। তাদের কাজ সম্ভাব্য পরের শব্দ, জনপ্রিয় রঙ, মনকাড়া বিট অনুমান করা। স্বভাবতই তারা গড়পড়তার দিকে ঝোঁকে। যখন সকলেই একই স্মার্ট সরঞ্জাম ব্যবহার করে, শিল্পকর্মগুলির রূপও প্রায় একরকম চেহারা নেবে।
এআইয়ের ফলে সৃজনশীলতায় যে মৌলিক বদল এসেছে, তা হল-
পুরনো ধারা: ভাবনা → খসড়া → সংশোধন → চূড়ান্ত।
নতুন ধারা: প্রম্পট → নির্বাচন → সামান্য বদল → চূড়ান্ত।
এর ফল যেমন দ্রুত মিলছে। তেমন তৃপ্তিও বড়ই তাৎক্ষণিক। ফলে দীর্ঘ সাধনার ফলে যে সন্তুষ্টি মিলত, তাও ক্রমশ ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে। তিন সেকেন্ডে যদি মেশিন লিখে দেয়, তিন বছর শেখার প্রয়োজন কোথায় ? এই মনোভাবই তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের মনে।
তবে এরপরও বলবো প্রযুক্তি শত্রু নয়। সমস্যা রয়েছে তার ব্যবহারবিধিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে ‘অ্যানালগ সংগ্রাম’-এর মূল্য ফেরাতে হবে। কাগজে আঁকা, অটো-কমপ্লিট ছাড়া লেখা, ভুলকে গ্রহণ করার অভ্যাস— এসবই সৃজনের ভিত মজবুত করে। স্মার্ট টুল থাকবে, কিন্তু তা যেন সহায়ক হয়, বিকল্প নয়।
শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যৎ তাদেরই উজ্জ্বল হোক, যারা শুধু ভাল প্রম্পট লেখে না, বরং সৃজনশীল ভাবনা ভাবতে পারে। যা কোনও যন্ত্র আগে দেখেনি। খসড়া যদি বাঁচে, তাহলেই বাঁচবে সৃজনশীলতা। এই বিশ্বাসের উপর ভর করেই পথ চলুক নতুন প্রযুক্তি। এটাই কাম্য।