তারেকের মন্ত্রিসভায় একমাত্র ‘হিন্দু’ মন্ত্রী

নতুন মন্ত্রিসভায় নিতাই রায় চৌধুরী পান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ৭৬ বছর বয়সে এসে আবার মন্ত্রিত্ব তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ইতিহাস কখনও কাউকে একেবারে বিদায় জানায় না। শুধু সময়ের আড়ালে সরিয়ে রাখে। সেই কথাই যেন সত্যিই হয়ে গেল। তিন দশকের দীর্ঘ বিরতির পর সেই ইতিহাসের মঞ্চেই আবার ফিরে এলেন নিতাই রায় চৌধুরী। আশির দশকে জাতীয় পার্টির সরকারে মন্ত্রী থাকা এই প্রবীণ রাজনীতিক ফের মন্ত্রিত্ব পেলেন তবে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে। শুধু তাই নয়, দলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি আজ তারেক রহমানের অন্যতম আস্থাভাজন মুখ। ফলে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন নিছক রাজনৈতিক পুনরাগমন নয়, বরং বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করছে। এয়োদশ জতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তাঁর নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় নিতাই রায় চৌধুরী পান সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। ৭৬ বছর বয়সে এসে আবার মন্ত্রিত্ব তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ে। এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আস্থার গভীর সমীকরণ। মাগুরা-২ আসন থেকে নির্বাচিত নিতাই রায় চৌধুরী ১ লাখ ৪৭ হাজার ভোট পেয়ে জয়ী হন। যা তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতারই প্রমাণ। এটি তাঁর সংসদীয় জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়, কিন্তু অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার দিক থেকে তিনি অনেক তরুণ রাজনীতিকের চেয়েও এগিয়ে।

কে এই নিতাই রায় চৌধুরী ?

১৯৪৯ সালে মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার হাটবাড়িয়া গ্রামে

এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নিতাই রায় চৌধুরী

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও চিন্তাশীল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক

ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক

সম্পন্ন করেন ও আইন পেশার সঙ্গে যুক্ত হন

সাহিত্যচর্চা ও আইনজ্ঞানের যুগল মেলবন্ধন নিতাই রায়ের

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে দিয়েছে আলাদা গভীরতা

ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিপ্লবী

ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামের

মধ্যে দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলেন

পরবর্তীকালে জাতীয় পার্টির টিকিটে ১৯৮৮ সালে চতুর্থ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমবার

সংসদে প্রবেশ করেন নিতাই রায় চৌধুরী

১৯৯০ সালে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক

দক্ষতার পরিচয় দেন ও পরে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিতাই রায় চৌধুরী বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ২০০১,২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। কিন্তু রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং সাংগঠনিক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখে ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আস্থাভাজন হিসেবে এবং পরবর্তীকালে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি দলের ভেতরে এক বিশ্বস্ত মুখ হয়ে ওঠেন। এই দীর্ঘ সময়ের আনুগত্য, ধৈর্য এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে আবার মন্ত্রিসভার কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে এনেছে। ব্যক্তিগত জীবনেও নিতাই রায় চৌধুরী এক সম্ভ্রান্ত ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারপ্রধান। প্রয়াত স্ত্রী ঝুমা রায় চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। তাঁদের মধ্যে মেয়ে নিপুন রায় চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং আরেক ছেলে মিথুন রায় চৌধুরী মাগুরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। অর্থাৎ রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড তিন ক্ষেত্রেই এই পরিবারটির সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় ৯ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা ও মোট সম্পদ ৪২ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা।

নতুন সরকারে নিতাই রায় চৌধুরীর ভূমিকা কেবল আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা হবে গভীর, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে তিনি জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম মূল স্তম্ভ। ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, সংগীত, নাটক ও লোকসংস্কৃতিকে নতুনভাবে সাজাতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁর সাহিত্য, সাংস্কৃতিক মনন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা মিলিয়ে এই মন্ত্রণালয়ে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। একই সঙ্গে দেশের তরুণ প্রজন্মকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা, গ্রামীণ শিল্প ও লোক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। শুধু তাই নয়, তারেক রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে তিনি সরকার ও দলের ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করবেন। রাজনৈতিক সংকট, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সাংগঠনিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ভরযোগ্য সহায়তায় পরিণত হতে পারে।

বলাই যায় যে, নিতাই রায় চৌধুরীর প্রত্যাবর্তন শুধুই একজন প্রবীণ রাজনীতিকের পুনরাগমন নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধারাবাহিকতা, ধৈর্য ও বিশ্বাসযোগ্যতার এক অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘ সময় ধরে উথ্থান-পতনের মধ্যেও তিনি নিজের আদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক আনুগত্য ধরে রেখেছেন যা বর্তমান রাজনীতির বাস্তবতায় অত্যন্ত বিরল। ক্ষমতার শীর্ষে ফিরে এসেও তাঁর জীবনযাপনের সংযম, চিন্তার গভীরতা ও সাংস্কৃতিক চর্চা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। এখন সামনে বড় প্রশ্ন এই অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও সংস্কৃতিমনস্কতার সমন্বয়ে তিনি নতুন সরকারের জন্য কতটা স্থায়ী ও ইতিবাচক উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেন। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মনে রাখে তাঁদেরই, যাঁরা কেবল ক্ষমতায় ছিলেন না, বরং চেতনাকে স্পর্শ করে যেতে পেরেছেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত ও অনিশ্চয়তার আবহ কাটিয়ে সরকার এখম মূলত স্থিতিশীলতা ফেরানো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা ও প্রশাসনিক সংস্কারের পথে হাঁটতে চায়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে সমঝোতার পথে হাঁটার বার্তা দিয়ে সরকার জাতীয় ঐক্যের আবহ তৈরি করতে চাইছে। যাতে দীর্ঘদিনের বিভাজন কাটিয়ে দেশকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতরে ফিরিয়ে আনা যায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। নতুন সরকার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ ও কূটনীতির পথে হাঁটতে চায়। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কে নতুন করে স্থিতিশীল ও ইতিবাচক রূপ দেওয়া। চিন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানো ও রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এই সবই ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক রূপরেখার অংশ। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ শান্তি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের সমন্বয়ে একটি আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলাই তারেক রহমানের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। এই পথচলা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সর্বোপরি জনগণের আস্থার উপরই।