ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী; জামাতের উল্কা উত্থান কীভাবে?

এর আগে জামায়াত সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল  ১২ শতাংশ। সেই ১২ শতাংশ ভোটকে আড়াইগুণ বৃদ্ধি করে ৩২ শতাংশ নিয়ে এবারে ময়দানে জামায়াত। তাহলে এটা কি চিন্তার কারণ নয়, বিএনপি বা তারেকের কাছে।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাস তৈরি করে গেল। এরকম শান্তিপূর্ণ ও উৎসবের মতো নির্বাচন  আগে কখনও দেখেনি বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, এত বিশাল জয়ের মুখও বিএনপি অতীতে দেখেনি। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষ করে ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে তারেক রহমানের প্রথম কথা ছিল আই হ্যাভ আ ড্রিম।  বলা যেতে পারে  সেই স্বপ্নপূরণের মসৃণ রাস্তা বাংলাদেশের জনতাই তাঁকে করে দিয়েছে। তাঁর স্বপ্নপূরণের সুযোগ যে তিনি খুবই সহজে পেয়ে গিয়েছেন, তা বললে কোনওদিক থেকে ভুল বলা হবে না। তবে স্বপ্নপূরণের পথ কি খুব একটা মসৃণ হবে ? নাকি কাঁটা বিছানো পথেই হাঁটতে হবে তারেককে? বিরোধী দলের আসনে জামায়াত। এক সময়ের বন্ধু এখন বিরোধী আসনে। বাংলায় একটা কথা রয়েছে। স্বার্থে ঘা লাগলে এক সময়ের পরম বন্ধু হয়ে ওঠে চরম শত্রু। একই ঘটনা ঘটবে না তো বিএনপি ও জামায়াতের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে? কতটা শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশের বিরোধী দল?

এবারের মতো এত বিশাল জয়ের মুখ বিএনপি অতীতে দেখেনি। অন্যদিকে এটা বলতেই হবে, এবারের মতো এত বিপুল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখিও হতে হয়নি জিয়াউর রহমান অথবা  খালেদা জিয়াকে। বিপুল চ্যালেঞ্জ? কেন বললাম এই কথা ? তারেকের দল এবার মোট ৫০ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে ৩২ শতাংশ ভোট পেয়েছে জামায়াত। অতীতের ফলাফল দেখলে, এই ভোট শতাংশ ঘোরাফেরা করত ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশের মধ্যে। সেই নিরিখে এবার ১৮ থেকে ২০ শতাংশের ভোট বেড়েছে। বিএনপির পাশাপাশি এবার যদি জামায়াতের দিকে নজর দেওয়া যায়, দেখা যাবে,

১৯৯১ সালে এককভাবে ভোট লড়ে জামায়াত

সে বছরে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পায় তারা

আসন জিতেছিল ১৮টি

ভোট পেয়েছিল ১২ শতাংশ

৫ বছর পর ১৯৯৬

আসন পায় ৩টি, শতাংশের নিরিখে ৯

২০০১ ও ২০০৮ সালে বিএনপির জোটসঙ্গী হয় জামায়াত

প্রথমবার ৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয় ১৭টি আসনে

দ্বিতীয়বার ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ২টি আসনে জয়

মানে কী দাঁড়াল? এর আগে জামায়াত সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল  ১২ শতাংশ। সেই ১২ শতাংশ ভোটকে আড়াইগুণ বৃদ্ধি করে ৩২ শতাংশ নিয়ে এবারে ময়দানে জামায়াত। তাহলে এটা কি চিন্তার কারণ নয়, বিএনপি বা তারেকের কাছে? আগের থেকে বহুগুণে শক্তিশালী হয়ে এখন ফিরেছে তারা। এবার যদি নির্বাচনী কেন্দ্র হিসাবে নজর দেওয়া যায়. তাহলে দেখা যাবে বেছে বেছে সেসব জায়গায় জামায়াত মাথাচাড়া দিয়েছে, যেখানে আওয়ামী লীগের প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশী। এতদিন হাসিনার দাপটে সেখানে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি অন্য কোনও দল। অবশষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কার্যত বলা যেতে পারে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বেরিয়ে গেল জামায়াত।

জামায়াতের উল্কা-উত্থান

রংপুরে ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৬টিতে জয়

রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টিতে জয়ী

দেশভাগের পর এসব অঞ্চলে ভারত থেকে চলে আসা মানুষদের মধ্যে জামায়াত প্রভাব বাড়িয়েছিল। এখানে বিএনপি কোনও কালেই খুব একটা উর্বর জমি বানাতে পারেনি। এবারেও তা করে উঠতে পারল না। অন্যদিকে এই এলাকাগুলো আবার ভারত-বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া। সীমান্ত থেকে কিছুটা ভিতরে খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া আর পাবনার অনেক আসনও জামায়াতের জোটের দখলে। সীমান্তে যদি ফিরে আসা যায়, কয়েকটি আসন বাদ দিলে যত উত্তরে এগোনো যায়, সেখানেও আবার রাজশাহী  ১ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। উত্তরাঞ্চলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামেও অনেক আসনে তারাই বিজয়ী। মোটের ওপর, জামায়াতে ইসলামীর জোট যে-সব এলাকায় জিতেছে, সেগুলি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ আর কিছুটা আসামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল।

তবে সবার চোখ কপালে উঠেছে ঢাকা ডিভিশনের ফলাফল দেখে। যেখানে জামায়াত কোনওদিন খাতাই খোলেনি। এবার সেখানে তারা ১৫টির মধ্যে ৬টি আসন জিতেছে। তাহলে এক কথায় দেখতে গেলে, সরকার গড়ল বিএনপি জোট। বিরোধী আসনে জামায়াত। কিন্তু তারাও যথেষ্ট শক্তিশালী। সরকার ও বিরোধী দ্বন্দ্ব চিরকালের। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, দুটি দলই দুজনের প্লাস পয়েন্ট ও মাইনাস পয়েন্ট ভালোমতোই জানেন। কারন তারা একসময়ে একজোট হয়ে ভোটে লড়েছে।  তাই কোন আসরে কোন চালে বাজিমাত হবে, তা ভালোই জানা আছে দুজনের। তাই সামনে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে তারেকের, তা বলাই যায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সংসদদের। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ২৩ মিনিটে জামায়াতের নবনির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। এদিনে শপথ বাক্য পাঠ করেন, এনসিপির জয়ী প্রার্থীরাও।

জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে অনুষ্ঠান হয়। জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পৃথকভাবে এই দুই শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদল নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। উপনেতা দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মহম্মদ তাহের। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে একটা নয়, রয়েছে অনেকগুলি চ্যালেঞ্জ। সামলাতে হবে অনেকগুলো দিক। বেহাল অর্থনীতিকে দাঁড় করানো তাঁর সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ। ব্যার্থ হলে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে হতাশা। এটা যথেষ্ট চিন্তার বিষয় তারেকের কাছে। বিএনপিকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা গগণচুম্বী। তা পূরণ করতে না পারলে যে হতাশা দেখা দেবে, জামায়াত তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করবে।