উজ্জ্বলার গ্যাস নিভে, আবার জ্বলছে কাঠের উনুন—গৃহিণীদের চোখে জল

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে আবার ফিরে এসেছে বহু বছর আগের সেই পুরোনো দৃশ্য। আধুনিক গ্যাসের চুলা যেন এখন শুধুই স্মৃতি রান্নাঘরের এক কোণে পড়ে রয়েছে এলপিজি সিলিন্ডার, আর উঠোনে নতুন করে তৈরি হচ্ছে মাটির উনুন।
কারণ একটাই—গ্যাসের তীব্র আকাল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বুকিং করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই বুকিং নেওয়া বন্ধ, আবার কোথাও বুকিং হলেও সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এমনকি বেশি দাম দিতে রাজি থাকলেও মিলছে না সিলিন্ডার। ফলে বাধ্য হয়েই আবার কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতে শুরু করেছেন গৃহিণীরা।ভোর হতেই সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামে দেখা যাচ্ছে এক করুণ ছবি। বাড়ির কাজ ফেলে গৃহিণীরা ছুটছেন ঝোপঝাড়, বাগান আর খালের ধারে। জ্বালানির জন্য কুড়িয়ে আনছেন শুকনো কাঠ, ডালপালা আর পাতা। কেউ আবার বাড়ির উঠোনেই নতুন করে বানাচ্ছেন মাটির উনুন।
কয়েক বছর আগেও এই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। কেন্দ্র সরকারের Pradhan Mantri Ujjwala Yojana চালু হওয়ার পর সুন্দরবনের বহু গরিব পরিবার প্রথমবারের মতো এলপিজি গ্যাসের সুবিধা পেয়েছিল। গৃহিণীরা তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। ধোঁয়ামুক্ত রান্নাঘর, কম সময়ে রান্না—সব মিলিয়ে জীবনে এসেছিল নতুন স্বাচ্ছন্দ্য।
কিন্তু এখন সেই স্বাচ্ছন্দ্য যেন অতীত।গ্রামের এক গৃহিণীর কথায়,“উজ্জ্বলা গ্যাস পাওয়ার পর আমরা কাঠ জ্বালানো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন গ্যাস নেই, বুকিং করলেও আসছে না। তাই আবার উনুন বানিয়ে কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতে হচ্ছে।”
আরেকজনের আক্ষেপ,
“গ্যাস থাকলে আধঘণ্টায় রান্না হয়ে যেত। এখন কাঠ কুড়োতে যেতে হয়, উনুন ধরাতে সময় লাগে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যায়।”
গৃহিণীদের মতে, শুধু কষ্টই নয়—স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। কাঠের উনুনে রান্না করতে গিয়ে ধোঁয়ার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে হচ্ছে। এতে চোখ জ্বালা, কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। যাতায়াতের সমস্যা ও সরবরাহের অনিয়মিততার কারণে অনেক সময় সিলিন্ডার পৌঁছাতেই দেরি হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এদিকে এই গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহণ ব্যবস্থাতেও। অনেক অটোরিকশা চালক জানান, গ্যাস না পাওয়ায় তাদের অটোরিকশাও ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ফলে বহু অটো রাস্তায় নামতেই পারছে না। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এক অটোচালকের কথায়,
“গ্যাস না পেলে অটো চালাব কী করে? বুকিং করেও গ্যাস মিলছে না। তাই অনেক দিন অটো বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”
সব মিলিয়ে গ্যাসের এই সংকটে সুন্দরবনের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যেন আবার কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে।
এদিকে সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন গৃহিণীরাই। তাদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—কবে কাটবে এই গ্যাসের সংকট?কবে আবার ফিরবে গ্যাসে রান্নার সেই স্বস্তি সুন্দরবনের হাজার হাজার গৃহিণী আজ সেই উত্তরই খুঁজছেন।