SIR এর ধাক্কায় বাংলার ১০০ কাছাকাছি আসনে ‘ নিঃশব্দে পরিবর্তন’। এই ভোটে বদলে যেতে পারে ক্ষমতার অঙ্ক।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্কে নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া-SIR (Special Intensive Revision অর্থাৎ কড়া ছাড়াই বাছাই-ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ, যা সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে অন্তত ১০০ কাছাকাছি আসনে ।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনই হতে পারে এই বিধানসভা নির্বাচনে। রাজ্যজুড়ে চলা এই SIR প্রক্রিয়ায় বহু জায়গায় ভোটার তালিকায় বড়সড় সংযোজন ও বিয়োজন হয়েছে। একাধিক জেলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ মত ভোটারের পরিবর্তন ঘটেছে-যা স্বাভাবিক নির্বাচনী অঙ্ককে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সেই সব আসনে, যেখানে জয়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম। ২০২১ সালের নির্বাচনে বহু আসনে জয়ের মার্জিন ছিল ৫০০ থেকে ৫,০০০ ভোটের মধ্যে। সেখানে যদি কয়েক হাজার ভোটারের পরিবর্তন ঘটে, তাহলে ফলাফল পুরোপুরি উল্টে যেতে পারে-এটাই এখন রাজনৈতিক মহলের মূল বিশ্লেষণ।
জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল-উত্তরবঙ্গ, নদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনা। এই তিন অঞ্চলেই ভোটার তালিকার পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে বেশি এবং রাজনৈতিক লড়াইও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের জায়গাগুলিতে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট।
বিজেপি দাবি করছে, দীর্ঘদিন ধরে “ভুয়ো ভোটার” বা অস্বচ্ছ তালিকার কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, SIR প্রক্রিয়া সেই ত্রুটি সংশোধন করছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা ভোটব্যাঙ্ককে টার্গেট করা হচ্ছে-যা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হতে পারে।
একদিকে রয়েছে পরিসংখ্যান-যেখানে ভোটারের সংখ্যা ও পরিবর্তন স্পষ্ট। অন্যদিকে রয়েছে মাটির বাস্তবতা-যেখানে সংগঠন, প্রার্থী এবং স্থানীয় ইস্যুই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, SIR-এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে “High Swing Zone”-এ থাকা আসনগুলিতে। এই তালিকায় প্রায় ৮০-১০০টি আসন রয়েছে বলে ধারণা। এই আসনগুলিতে ভোটের অঙ্ক এতটাই সূক্ষ্ম যে, কয়েক হাজার ভোটের ওঠানামাই সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল-এই পরিবর্তন ভোটারদের আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন ভোটারদের সংযোজন, পুরনো ভোটারদের বাদ পড়া-এই সব মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলিকে নতুন করে কৌশল সাজাতে হচ্ছে। বুথ স্তরে সংগঠন মজবুত করা, নতুন ভোটারদের কাছে পৌঁছনো-এই সব বিষয় এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর নির্বাচন শুধু প্রচার, প্রার্থী বা ইস্যুর লড়াই নয়-এটি পরিণত হচ্ছে ডেটা, ডেমোগ্রাফি এবং সংগঠনের সূক্ষ্ম সমন্বয়ের এক জটিল যুদ্ধে। SIR-এর এই নীরব পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত বাংলার ক্ষমতার সমীকরণে কতটা বড় ভূমিকা নেয়, এখন সেটাই দেখার।