জঙ্গলমহলের এই হাই-প্রোফাইল আসনে কি এবার লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে চলেছে? আদিবাসী ভোট কি নির্ধারণ করবে ফলাফল, নাকি তৃণমূলের সংগঠনই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে রাখবে বিরবাহা হাঁসদাকে?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী দেবনাথ হাঁসদা ১ লক্ষ ভোট পেয়ে জয় লাভ করেন। বিজেপির পালন সরেন পেয়েছিলেন ৬০ হাজার ভোট। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও এই আসনটি তৃণমূলের কব্জাতেই ছিল। সেবারে তৃণমূল প্রার্থী ৯৫ হাজার ভোট পেয়ে জয়যুক্ত হন। এই কেন্দ্রে এবার তৃণমূলের হয়ে বিদায়ী মন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদা। বিজেপির হয়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রণত টুডু। জঙ্গলমহলের এই আসন বরাবরই সুইং প্রবণ, ফলে কোনও দলই এখানে একেবারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে না। আদিবাসী ভোটারদের বড় অংশ এই কেন্দ্রের ফল নির্ধারণ করে, আর সেই ভোট যদি একদিকে একজোট না থাকে। তাহলে লড়াই দ্রুত হাড্ডাহাড্ডি হয়ে ওঠে। বিজেপি গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলে তাদের সংগঠন ধরে রেখেছে এবং স্থানীয় ইস্যু, বিশেষ করে বনাধিকার, কর্মসংস্থান ও কুর্মি-আদিবাসী পরিচয়ের প্রশ্ন তুলে ধরে ভোটে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
ঝাড়গ্রাম জেলার রাজনীতিতে বীরবাহা হাঁসদা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম হলেও এবারের নির্বাচনে তাঁর লড়াইয়ের সমীকরণ কিছুটা বদলে গিয়েছে। কারণ তিনি আর ঝাড়গ্রাম আসনে প্রার্থী নন, তাঁকে বিনপুর কেন্দ্রে লড়াইয়ে নামানো হয়েছে। ফলে ঝাড়গ্রামে সরাসরি বীরবাহাকে ঘিরে যে লড়াইয়ের ছবি দেখা যেত, তা আর নেই। তবে জঙ্গলমহলের সামগ্রিক রাজনৈতিক চরিত্র একই রয়ে গেছে। এখানে ভোট অনেকটাই সুইং নির্ভর, এবং আদিবাসী ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনপুর কেন্দ্রে বিরবাহা হাঁসদার লড়াই তাই একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনই তাঁর পক্ষে কিছু স্পষ্ট সুবিধাও রয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ের কারণে তাঁর ব্যক্তিগত জনভিত্তি এখনও শক্তিশালী। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে সর্বভারতীয় তৃণমূল যোগ দেন। ২০২১-র বিধানসভা ভোটে জয় পেয়ে মন্ত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠনগত শক্তি তাঁকে এগিয়ে রাখছে। তবে বিজেপিও জঙ্গলমহলে তাদের সংগঠন ধরে রেখেছে, এবং আদিবাসী ও স্থানীয় ইস্যুগুলিকে সামনে এনে তারা লড়াইকে টাইট করার চেষ্টা করছে।
বিনপুর বিধানসভা কেন্দ্র। এই আসনটি সংগঠনের থেকে প্রার্থীর মুখকে বেশই প্রাধান্য দেয়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, সাঁওতালি চলচ্চিত্র জগতের জনপ্রিয় মুখ বিরবাহার ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ভোট আবহে হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় প্লাস পয়েন্ট। তিনি মন্ত্রী হওয়ার পর ঝাড়গ্রামের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি, যা তাকে সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে রেখেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী এবং জঙ্গলমহলের জন্য বিশেষ চাল ও খাদ্যসামগ্রী প্রদানের মতো উন্নয়ণমূলক প্রকল্পের সুবিধা ভোটারদের একটা বড় অংশকে তৃণমূলের দিকে টানতে পারে।
পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু নেগেটিভ দিকও। যা চাপে ফেলতে পারে তৃণমূল প্রার্থীকে। ঝাড়গ্রামের রাজনীতিতে কুড়মি সমাজের এসটি মর্যাদার দাবি একটি বড় ফ্যাক্টর। বিরবাহা হাঁসদার সঙ্গে কুড়মি আন্দোলনের নেতাদের অতীতে কিছু সংঘাত হয়েছে, যা ২০২৪-এর লোকসভা ভোটেও প্রভাব ফেলেছিল। এই ক্ষোভ ২০২৬-এ ভোট ব্যাঙ্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বিজেপি গত কয়েক বছরে জঙ্গলমহলের আদিবাসী প্রধান গ্রামগুলোতে নিজেদের মাটি শক্ত করেছে। বিশেষ করে ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের মতো প্রভাবশালী সামাজিক সংগঠনের একটি অংশ শাসক দলের ওপর রুষ্ট হলে আদিবাসী ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সব দিক বিচার করলে বলা যায়, বিরবাহা হাঁসদার ক্ষেত্রে এবারের ভোট পুরোপুরি একতরফা নয়, বরং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা হাড্ডাহাড্ডি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আদিবাসী ভোট ভাগ হলে বা স্থানীয় অসন্তোষ বাড়লে লড়াই কঠিন হবে। ২০২৬-এর ভোটে তাঁর মূল লড়াই হবে কুড়মি-আদিবাসী সমীকরণ সামলানো এবং লোকসভা ভোটে বিজেপির দিকে চলে যাওয়া আদিবাসী ভোটগুলোকে ফিরিয়ে আনা। তবে তার নিজের কাজের দক্ষতা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী প্রকল্পগুলো তাকে এগিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। তবে সামগ্রিকভাবে তিনি এখনও কিছুটা এগিয়ে, তাই এই লড়াইকে বলা যায় ক্লোজ ফাইট।