ডেন্টিস্টের ছদ্মবেশে মোসাদের এজেন্ট?

ডেন্টিস্টের ছদ্মবেশে মোসাদের এক এজেন্ট নাকি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছিল খামেনেইেয়ের ঘনিষ্ট বৃত্তে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশ যেন আজ আর শুধুই আকাশ নেই সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে যুদ্ধের গন্ধ। গুপ্তচরবৃত্তির ছায়া আর অনিশ্চয়তার ভারী মেঘ জমেছে। প্রতিটি মুহূর্তে নতুন নতুন তথ্য পাল্টা দাবি আর অস্বীকারের ভিড়ে সত্য যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে। এই উত্তাল আবহেই সামনে এসেছে একের পর এক বিস্ফোরক দাবি, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ইজরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ এবং ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। শোনা যাচ্ছে, ডেন্টিস্টের ছদ্মবেশে মোসাদের এক এজেন্ট নাকি ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছিল খামেনেইেয়ের ঘনিষ্ট বৃত্তে। নিখুঁত পরিকল্পনায়, আর সেই গুপ্ত অনুপ্রবেশের সূত্র ধরেই অপারেশন এপিক ফিউরির সূচনা। যার প্রথম দিনেই টার্গেটেড হামলায় মোজতবা খামেনেই গুরুতর জখম। এমনকি তাঁকে শেষ করা হয়েছে বলেও দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে। যদিও এই দাবির কোনও স্বাধীন আন্তর্জাতিক নিশ্চিতকরণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবুও ঘটনাটি ঘিরে চাঞ্চল্য তুঙ্গে। একইসঙ্গে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে তাঁর পুত্র মোজতবা খামেনেইও নাকি সেই হামলার অভিঘাতে গুরুতর আহত হয়ে আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন ধারাবাহিক গোয়েন্দা তথ্য আর পরিকল্পিত আঘাতে ইরান যেন ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। তবে তেহরানও চুপ করে থাকার পাত্র নয়। বরং পাল্টা আঘাতে তারা আরও আক্রমণাত্মক। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম দাবি করেছে তেল আভিভে অবস্থিত মোসাদের সদর দফতর ভয়াবহ হামলায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। একটি বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও তার সত্যতা এখনও যাচাই করেনি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। ইজরায়েলের পক্ষ থেকেও এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে যদি এই দাবি সত্যি প্রমাণিত হয় তাহলে তা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলার পর আবারও গোয়েন্দা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। যুদ্ধের উত্তাপ কিন্তু শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই তা ছড়িয়ে পড়েছে কূটনীতি, অর্থনীতি ও পরিকাঠামোর ওপরেও। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে চাপ দিতে গিয়ে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, শান্তিচুক্তিতে দ্রুত না এলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। কিন্তু তেহরান সেই চাপকে নস্যাৎ করে উল্টে হিটলিস্ট প্রকাশ করে উপসাগরীয় দেশগুলির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেতুকে নিশানা করার হুমকি দিয়েছে। ফলে এই সংঘাত এখন আর শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ক্রমশ আঞ্চলিক অস্থিরতা ও বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

এরই মধ্যে আরও চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে ইরান নাকি আমেরিকার অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করেছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটে এবং পাইলটের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আবার অন্য এক ঘটনায়, এফ-১৫ ধরনের একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে পাইলটকে জীবিত অবস্থায় আটক করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। শুক্রবার দুই পৃথক ঘটনায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। বলা হচ্ছে পাইলট প্যারাস্যুটে নামার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডের হাতে বন্দি হন। আমেরিকার বিশ্বাস ছিল ওই বিমানের পাইলট হয়ত জীবিত রয়েছেন। তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। আইআরজিসির তরফে এই বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি খারিজ করেছে আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড। তবে এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানে যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ার খবর স্বীকার করে নেন ট্রাম্প। তবে এর কোনও প্রভাব ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সমঝোতার আলোচনায় পড়বে না বলে তিনি দাবি করেছেন। সমঝোতায় আমেরিকা যে আগ্রহী তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই প্রথম ইরানে কোনও যুদ্ধবিমান খোয়ানোর কথা স্বীকার করলেন ট্রাম্প। মার্কিন ওই যুদ্ধবিমানের এক পাইলট এখনও যে নিখোঁজ সেই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সূত্রের খবর ইরান শুক্রবার অন্তত পাঁচটি মার্কিন হেলিকপ্টারে আঘাত হেনেছে। পাল্টা পাইলটকে ধরতে বিশাল অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করেছে ইরান। নিখোঁজ মার্কিন ক্রুকে জীবিত ধরিয়ে দিলে ৬৬,১০০ ডলার পুরস্কার ঘোষণা যা ভারতীয় মুদ্রায় ৬১ লক্ষ ৩০ হাজার ১১০ টাকা।

যুদ্ধের এই উত্তাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনেও। আবু ধাবিতে মিসাইলের ধ্বংসাবশেষে আহত হয়েছেন বহু মানুষ। যাঁদের মধ্যে ভারতীয় ও নেপালের নাগরিকও রয়েছেন। কুয়েতে হামলায় এক ভারতীয় কর্মীর মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে। একমাসের এই সংঘাতে ইতিমধ্যেই একাধিক ভারতীয় প্রাণ হারিয়েছেন। যা ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় জ্বালানি সরবরাহে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা আর সেই কারণেই আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক বৈঠক হলেও এখনও সমাধানের পথ খোলা যাচ্ছে না। এই উত্তাল পরিস্থিতির মাঝেই আমেরিকার অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে টানাপোড়েন। যুদ্ধের আবহে আচমকা সেনা সর্বাধিনায়কত ব়্যান্ডি জর্জকে বরখাস্ত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। জল্পনা উঠছে, যুদ্ধনীতি নিয়ে মতবিরোধই কি এই সিদ্ধান্তের কারণ? একইসঙ্গে আমেরিকার সাধারণ মানুষের একাংশও যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। এই সংঘাত এখন আর শুধুই সীমান্তের লড়াই নয়। এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের এক জটিল যুদ্ধ। কোথাও সত্য, কোথাও গুজব আবার কোথাও কৌশল সব মিলিয়ে যেন এক অদৃশ্য দাবার বোর্ডে চলছে ভয়ংকর খেলা। শেষ পর্যন্ত কে এই খেলায় জিতবে তা তো সময়ই বলবে।