মনোনয়ন জমা দিতে গিয়েই বাধার মুখে। রাজনৈতিক চক্রান্তের অভিযোগ রাজন্যার।

স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : সময় ভালো যাচ্ছে না রাজন্যা হালদারের। একি গেরোয় পড়েছেন তিনি। মাঠে ময়দানে নেমে তো প্রচার করছেন। শাসকের বিরুদ্ধে গলা ফাটাচ্ছেন। কিন্তু আদৌ তিনি কি ভোটে লড়তে পারবেন তো। দু দুটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। আসানসোল দক্ষিণ ও সোনারপুর দক্ষিণ। ইতিমধ্যেই প্রার্থী পদ বাতিলের ধাক্কা খেলেন রাজন্যা। বাতিল হয়ে গেল রাজন্যার মনোনয়ন। আদৌ কি ভোটে লড়ার স্বপ্নপূরণ হবে রাজন্যার। এ যেন ঢাল তরোয়াল ছাড়া যুদ্ধে নামার মতো অবস্থা। এবার কী করবেন রাজন্যা। তিনি যে সোনারপুর থেকে আসানসোলে ঘরের মেয়ে হয়ে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভোটারদের। বাংলার স্বংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি। সেইসব প্রতিশ্রুতির কী হবে যদি ভোটে লড়তে না পারেন। চক্রান্তের অভিযোগে সরব রাজন্যা। কে চক্রান্ত করছে রাজন্যার বিরুদ্ধে। তবে কী দুটি কেন্দ্রেই প্রার্থীপদ বাতিল হয়ে গেল রাজন্যার। হাইকোর্টে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। কী হল রাজন্যার ?
বাংলার ভোটযুদ্ধে বহুল চর্চিত নাম রাজন্যা হালদার। রাজনীতির ময়দানে হাতেখড়ি তৃণমূলের হাতধরে। ২১ এর মঞ্চে প্রথম দেখা। তারপর থেকেই রাজনীতির ইতিবৃত্তে চলে আসেন রাজন্যা হালদার। এরই মাঝে শাসক দলের সঙ্গে অম্ল-মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় তৃণমূল কংগ্রেসের উঠতি যুবনেত্রীর। আর সেই খারাপ সম্পর্কের ফাটল যতদিন গেছে ততই বেড়েছে। শেষমেশ শাসক শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নির্দল হয়ে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন রাজন্যা হলদার। প্রথমে জল্পনা তৈরি তাঁর বিজেপিতে যাওয়া নিয়ে। পরে অবশ্য নির্দল প্রার্থী হয়ে লড়াইয়ের মঞ্চে অবতীর্ণ রাজন্যা। একটি নয় একেবারে দু দুটি কেন্দ্রে প্রার্থী হয়ে লড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। আর তাতেই বেঁধেছে গোল। মনোনয়ন পেশ করতে গিয়ে একি গেড়ো। এমনটা হবে তা আদৌ কল্পনা করতে পারেননি তিনিও। ভোটের আগেই বড় ধাক্কা খেয়ে বসলেন তিনি। আসানসোল দক্ষিণে কেন বাতিল হল রাজন্যার মনোনয়ন। তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন রাজন্যা। তাাঁর অভিযোগ, ৬ এপ্রিল মনোনয়ন জমা দিতে যাওয়ার সময় ১০ জন প্রস্তাবকের মধ্যে ছ’জন পথে আটকে পড়েন। পরে বিকল্প প্রস্তাবক নিয়ে পৌঁছনো হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার অজুহাতে তাঁদের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। রাজন্যার দাবি, এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক চক্রান্ত। তাঁর আরও অভিযোগ, একই দিনে জামুড়িয়ার এক প্রার্থী বিকেল ৫টা নাগাদ প্রস্তাবক নিয়ে এসেও মনোনয়ন জমা দিতে পেরেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তিনি নির্বাচন কমিশন ও পশ্চিম বর্ধমানের ডিস্ট্রিক্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে ইতিমধ্যেই অভিযোগ জানিয়েছেন। এতেই থামছেন না রাজন্যা। প্রয়োজন হলে এই ইস্যুতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। যদিও রাজন্যা একা নন,পশ্চিম বর্ধমান জেলার নয়টি কেন্দ্র মিলিয়ে মোট ৯৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। এর মধ্যে ২৯ জন হলেন নির্দল প্রার্থী। তার মধ্যে চারটি মনোনয়ন বাতিল হয়েছে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভায়। সেই তালিকায় রয়েছেন নির্দল প্রার্থী রাজন্যা হালদার, আম জনতা উন্নয়ন পার্টির ইমরান খান এবং দুই নির্দল প্রার্থী সুনীলচন্দ্র চৌরাসিয়া ও দীপিকা বাউড়ির মনোনয়নও বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি কুলটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্দল প্রার্থী আস্তিক দাসের মনোনয়নও বাতিল হয়েছে।

সোনারপুর দক্ষিণেও ঝুলে রাজন্যার ভাগ্য। গত শুক্রবার বারুইপুর মহকুমা শাসকের দপ্তরে মনোনয়ন পত্র জমা দিতে গিয়ে রাজন্যা হালদার একাধিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁর নথিতে একাধিক গোলযোগ দেখা গিয়েছিল। আসলে নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রার্থীকে মনোনয়ন পত্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের নথিপত্র জমা দিতে হয়। কিন্তু রাজন্যার নথিপত্র যাচাইয়ের সময় তাঁর অ্যাকাউন্টে কিছু অসংগতি ধরা পড়েছিল। পরে অবশ্য সমস্যা কাটিয়ে রাজন্যা মনোনয়ন জমা দেন। আসানসোল কেন্দ্রের মনোনয়ন জমা ও স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শেষ। তবে সোনারপুর দক্ষিণ কেন্দ্রে তাঁর মনোনয়ন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বাকি। ১০ এপ্রিল স্ক্রুটিনির পরেই পরিষ্কার হবে তাঁর অবস্থান। আদৌ কি রাজন্যার ভোটে লড়াই করার স্বপ্ন পূরণ হবে কি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও সোনারপুর দক্ষিণ নিয়ে আশাবাদী রাজন্যা হালদার। এই কেন্দ্রে টাফ ফাইট হলেও নিজেকে ঘরের মেয়ে বলে মানুষের কাছে পৌঁছেও যাচ্ছেন তিনি। নাওয়া খাওয়া প্রচারও চালাচ্ছেন পুরোদমে। একসময় তৃণমূল ছাত্র পরিষদের পরিচিত মুখ ছিলেন রাজন্যা। একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবসের মঞ্চে তার বক্তব্য নজর কেড়েছিল । তবে আরজি কর-কাণ্ড ঘিরে একটি টেলিফিল্ম নির্মাণ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি । তার জেরেই দল থেকে সাসপেন্ড হন । পরে বিজেপি নেতা সজল ঘোষের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত কোনও দলেই যোগ দেননি রাজন্যা । নির্দল হিসেবেই লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেন । এবারের নির্বাচনে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, তৃণমূলের লাভলী মৈত্র এবং বিজেপির রূপা গঙ্গোপাধ্যায় । দু’জনেই পরিচিত মুখ, বিনোদন জগতের সঙ্গে যুক্ত । তবে রাজন্যার কৌশল স্পষ্ট, ‘তারকা’ নয়, ‘স্থানীয় মুখ’ ইস্যুকেই সামনে রাখা । তার দাবি, এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন, যা ভোটে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে । রাজন্যার কথায়, একসময় সোনারপুর তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল, যা এখন হারিয়ে যাচ্ছে । নির্বাচিত হলে সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি । সবই তো ঠিক আছে কিন্তু যদি ফের মনোনয়ন বাতিলের ধাক্কা খেতে হয় তাহলে কী করবেন রাজন্যা হালদার।