রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাইদের মৃত্যু একাধিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জমানায় সেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থাণ আন্দোলন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থাণের প্রথম শহিদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাইদ। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাইয়ের আন্দোলনের বিকেলটাও ঠিক তেমনই ছিল। গণঅভ্যুত্থাণে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন আবু সাইদ। কোনও অস্ত্র নেই, কোনও সুরক্ষা নেই। ছিল শুধু সাহস আর প্রতিবাদের ভাষা। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাইদ তখন কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ। চারিদিকে যখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে তখনই সাইদ নিজের শরীরকেই বানিয়েছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক। তাঁর হাতে সেই সময় ছিল শুধু একটি বাঁশের লাঠি। পুলিশের রাবার বুলেট ছুটে এসে আঘাত করে তাঁর বুকে। মুহূর্তে তিনি লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। তাঁর মৃত্যু এক প্রশ্নের জন্ম দেয়, যা গোটা বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
সেই দিনের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় ওঠে। প্রতিবাদের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই বলেছিলেন ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার প্রতীক আবু সাইদ। তারপর শুরু হয় দীর্ঘ প্রতীক্ষা। ন্যায় বিচারের প্রতীক্ষা। তদন্ত শুরু হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আইনি লড়াই। সেই লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল যখন সাইদের বাবা আদালতে দাঁড়িয়ে নিজের সন্তানের শেষ মুহূর্তের কথা বলেন। তাঁর গলায় সেই দিন ছিল ন্যায়বিচারের দাবি। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে যখন ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এই মামলার রায় ঘোষণা করে। প্রাক্তন এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যদণ্ড দেওয়া হয়। আরও তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয়। মোট ৩০ জন দোষী সাব্যস্ত হলেও তাদের মধ্যে ২৪ জন এখনও পলাতক। যা এই বিচারকে আংশিক হলেও অসম্পূর্ণ করে রাখে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই সাজা ঘোষণা করে। তাঁরা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন পুলিশের প্রাক্তন এএসআই আমির হোসেন ও প্রাক্তন কনস্টেবল সুজনচন্দ্র রায়কে। দুজনেই এখন জেলে রয়েছেন। যাবজ্জীবন সাজা হওয়া তিন আসামিও প্রাক্তন পুলিশকর্মী। তাঁরা হলেন প্রাক্তন সহকারী কমিশনার মহম্মদ আরিফুজ্জামান, প্রাক্তন পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ও প্রাক্তন উপপরিদর্শক এসআই বিভূতিভূষণ রায়। তিনজনই এখন পলাতক।

তবে এই মামলার অধিকাংশই অভিযুক্তই এখনও আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য মহম্মদ হাসিবুর রশীদ। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার। ওই দফতরের কর্মী, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্র তথা আওয়ামী লীগের নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য রশীদ-সহ ২৪ জন দোষী বর্তমানে পলাতক। আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, এই পুলিশ আধিকারিকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতেই সেদিন সাইদের ওপর গুলি চলেছিল। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আবু সাইদ দাঁড়িয়েছিলেন সেই ঘটনার ভিডিও এখনও দগদগে মানুষের মনে। কেউই সেই ঘটনার কথা ভুলে যায়নি। পুলিশ যখন বারবার তাঁর বুকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় সেই দৃশ্য গোটা দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের এই রায় সেই লড়াইয়েরই নৈতিক জয় হিসেবে দেখছেন ছাত্র সমাজ। সাইদের পরিবার অবশ্য বিচারের শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুই প্রত্যক্ষ ঘাতকের ফাঁসির আদেশে তাঁরা কিছুটা হলেও সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছেন। যদিও এখনও পর্যন্ত অধিকাংশ অভিযুক্ত অধরা। এই রায় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। দেরি হলেও বিচার পাওয়া যায়। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ন্যায়বিচার কতটা দরকার। আবু সাইদের মৃত্যু হয়তো একটি জীবনকে থামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর সেই পুলিশের গুলিকে ভয় না পাওয়া সাহস মানুষের মনে এক নতুন ভাবনাকে জাগিয়ে তুলেছে।