নজরে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র

আদিবাসী এবং তফসিলি জাতি ভোটারদের মন পাওয়া বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ছোটন সেনগুপ্ত, নিজস্ব সংবাদদাতা : পুরনো চাল কি ভাতে বাড়বে? আসানসোল দক্ষিণের প্রাক্তন বিধায়ক তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় কি পারবেন তৃণমূলের হারানো দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে? নাকি বর্তমান বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালের ওপরই ভরসা রাখবে আসানসোল? খনি অঞ্চলের ক্ষোভ না লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের জাদু? সাধারণ মানুষের ভোটে কোন ইস্যুটি বেশি প্রভাব ফেলবে? নির্দল ও বাম-কংগ্রেস কি ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে এবারের ভোটে?

আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২৬-র ভোট একেবারে হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। গত কয়েকটি নির্বাচনে ক্লোজ ফাইট দেখেছে এই কেন্দ্র। আর এবারের সমীকরণ সেই লড়াইকে আরও টানটান করে তুলেছে। একদিকে রয়েছেন তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ, বহুবারের প্রার্থী। এলাকায় পরিচিত মুখ। অন্যদিকে অগ্নিমিত্রা পাল। ২০২১-এ জিতে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি। সিপিএম প্রার্থী শিল্পী চক্রবর্তী। কংগ্রেসের শৌভিক মুখোপাধ্যায়। এবারে এখানের ভোট হাড্ডহাড্ডি হবে বলেই মনে করা যাচ্ছে।

এখানকার জনবিন্যাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। শিল্পাঞ্চল হওয়ার সুবাদে এখানে অবাঙালি, মূলত হিন্দিভাষী ভোটারদের সংখ্যা বেশ ভালো। তাঁদের বড় প্রভাব রয়েছে এখানে। এই কেন্দ্রে তফসিলি জাতির ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২০-২২ শতাংশ। তফসিলি উপজাতির ভোটারের সংখ্যা ৫-৭ শতাংশের কাছাকাছি। আদিবাসী এবং তফসিলি জাতি ভোটারদের মন পাওয়া বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সংখ্যালঘুদের মধ্যে এই কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ গত নির্বাচন পর্যন্ত তৃণমূলের দিকেই ঝুঁকেছিল। তবে এবার মহিলা ভোটাররা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম নিরাপত্তা, এই দুয়ের মধ্যে কোন ইস্যুকে বেছে নেবেন, সেটাই দেখার।

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় একজন বেশ শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী। অতীতেও এই আসনের বিধায়ক ছিলেন । ২০১১ ও ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে জয়ী হন। বর্তমানে তিনি রানিগঞ্জের বিধায়ক। তবে তা সত্বেও আসানসোল দক্ষিণে তার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। তিনি এই অঞ্চলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। এলাকার মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ২০২৬-এর নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি আসানসোল পুর নিগমের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নিয়মিত প্রচার ও জনসভা করছেন, যা তার সক্রিয়তাকে প্রমাণ করে।

আসানসোল দক্ষিণে প্রধানত লড়াই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এখান থেকে জয়ী হয়েছিলেন, তাই ২০২৬-এ আসনটি পুনরুদ্ধার করা তৃণমূলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দলের অন্যতম প্রধান বাজি ধরা হচ্ছে।

বর্তমান বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল পুনরায় এই আসন থেকে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। ২০২১-এ ৪২.৮% ভোট পেয়ে তৃণমূল প্রার্থী সায়নী ঘোষকে পরাজিত করেছিলেন অগ্নিমিত্রা। ভোট মার্জিন ছিল খুবই কম। মার্জিনের সংখ্যাটা ছিল ৪ হাজার ৪৮৭। ২০২৬-র ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিশাল জনসভা এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির প্রচার বিজেপির পক্ষে হাওয়া টানতে সাহায্য করছে। তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় এই এলাকার মানুষদের হাতের তালুর মতোন চেনেন। শাসকের কুর্সিতে তৃণমূল আসার পর থেকে এই আসন তিনি নিজের কব্জায় রেখেছেন। কিন্তু গন্ডোগোলটা হয়ে যায় ২০২১-র নির্বাচনে। তৃণমূলের জন্য এখানকার মাটি উর্বর ভেবেই নিয়েছিল তৃণমূল। তাই এই আসনে দুবারের জেতা তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে এখানে প্রার্থী করা হয় তারকা মুখ সায়নী ঘোষকে। কিন্তু না… সেবারে তারকা মুখ দেখে ভোটে জিততে পারেনি তৃণমূল। মাটি কামড়ে পড়ে থাকা অগ্নিমিত্রা পাল কম মার্জিন হলেও সেবারে জয় ছিনিয়ে নেন। এবারে তাই সেই ভুলটা আর করল না তৃণমূল। যার হাত ধরেই দুবারের ভোট জিতেছিল তৃণমূল, সেই তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরেই ভরসা রাখল ঘাসফুল শিবির। তৃণমূল প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় তার পুরনো অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে হারানো জমি ফিরে পেতে মরিয়া।

আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে ২০২৬ সালের ভোট একেবারে হাড্ডাহাড্ডি হওয়ার সব লক্ষণই স্পষ্ট। এই কেন্দ্র এমনিতেই গত কয়েকটি নির্বাচনে ক্লোজ ফাইট দেখেছে, আর এবারের সমীকরণ সেই লড়াইকে আরও টানটান করে তুলছে। আসানসোল দক্ষিণ একটি শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানে ভোট অনেকটাই নির্ভর করছে কর্মসংস্থান, শিল্পের অবস্থা, কয়লাখনি সমস্যা এবং নাগরিক পরিষেবার ওপর। তৃণমূল সংগঠন ও সরকারি প্রকল্পের জোরে এগোতে চাইছে, আর বিজেপি বর্তমান অসন্তোষ, শিল্প সংকট ও আইন-শৃঙ্খলার ইস্যুকে সামনে এনে আক্রমণ করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই কেন্দ্রে ভোটাররা মূলত দুই শিবিরে প্রায় ভাগ হয়ে রয়েছে, ফলে সামান্য সুইং-ই ফল পাল্টে দিতে পারে। হতে চলেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই।