আশার কেরিয়ারের ঝুলিতে ছিল ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২,০০০-এর বেশি গান।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : এভারগ্রিন। এই শব্দটা যেন কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোসলের সঙ্গে ভীষণভাবে যায়। সবসময় পরিপাটি হয়ে থাকা, সদা হাস্যময় এক সহজাত স্বভাবের অসামান্য প্রতিভা। অগণিত অনুরাগীদের চোখের জলে বিদায় নিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ও বহুমুখী নেপথ্য সঙ্গীতশিল্পী ।
আশা ভোঁসলে, ভারতীয় সঙ্গীতজগতের অন্যতম নক্ষত্র, বিশ্বসঙ্গীতের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম৷ জন্মগ্রহণ করেন ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ সালে সাঙ্গলিতে। সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠা আশার৷ তাঁর বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন একজন খ্যাতনামী শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও থিয়েটার অভিনেতা এবং মা সেবন্তী । বাবার কাছেই তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।পাঁচ ভাইবোন– লতা, আশা, ঊষা, মীনা এবং হৃদয়নাথ। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃহারা হন আশা ৷ চার বছরের বড় দিদি লতা মঙ্গেশকর কাঁধে তুলে নিলেন সংসারের দায়িত্ব৷ আশাও দিদির পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন৷ বাবার পরিচিত মাস্টার বিনায়ক, তিনিই ছোট্ট লতা আর আশাকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করালেন সিনে দুনিয়ার সঙ্গে। ১৯৪৩ সালে ১০ বছর বয়সে মারাঠি সিনেমা ‘মাজা বাল’ সিনেমায় ‘চলাচল নওবালা গান’ দিয়ে সঙ্গীতজগতে পদার্পণ করলেন আশা ভোঁসলে৷ এরপর ১৯৪৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘চুনারিয়া’-তে তিনি প্রথম প্লেব্যাক করেন। এরপর ১৯৪৯ সালে ‘রাত কি রানী’ ছবিতে আশা ভোঁসলে প্রথমবার একক গান গাওয়ার সুযোগ পেলেন৷ ততদিনে লতা মঙ্গেশকর সঙ্গীতজগতে পরিচিত৷ ১৬ বছরের আশা আর ২০ বছরের লতা দুই বোন মিলে মঙ্গেশকর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ফিরিয়ে আনলেন৷
৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে টানা তিন ঘণ্টা পারফর্ম করেছিলেন তিনি। রবিবার সকালে অসুস্থতার কারণে মারা গেলেন আশা। কিন্তু তাঁর ‘শ্বাসপ্রশ্বাস’, তাঁর সঙ্গীত অমর হয়ে রইল। আশার কেরিয়ারের ঝুলিতে ছিল২০টিরও বেশি ভাষায় ১২,০০০-এর বেশি গান। ভারতীয় সঙ্গীতে অনন্য অবদানের জন্য দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে পেয়েছিলেন পদ্মভূষণ। তা ছাড়া, ১৯৯৭ সালে গ্র্যামির জন্যও মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আশা ভোঁসলে সাতবার ফিল্মফেয়ার সেরা নেপথ্য গায়িকার পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৭৭ সালের পর তিনি জানান যে তার নাম যেন আর ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য গণ্য করা না হয়। ২০০১ সালে তিনি ‘ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার’ পান। আশার পেশাগত জীবন সাফল্যের আলোয় যতটা রঙিন, ব্যক্তিজীবন ছিল ততোধিক আঁধারময়।

১৬ বছরের কিশোরী মন দিয়েছিলেন ২০ বছরের বড় গণপতরাও ভোঁসলেকে। দিদি লতা মঙ্গেশকরের ম্যানেজার ছিলেন গণপত রাও ভোঁসলে। গণপতরাওয়ের সঙ্গে আশার সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি আশার পরিবার। পরিবারের অমতেই পালিয়ে গিয়ে বিয়েও করলেন আশা। এরপর শুরু হল আরেক সংগ্রাম। সংসারে টিকে থাকার লড়াই৷ প্রেমের মাশুল দিতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্কচ্ছেদ হয়েছে আশার৷
উদয়স্ত খেটে চলেছেন আশা৷ সংসারের কাজ, বাচ্চার দেখভাল সব করেও গনপত রাওয়ের চাপে পড়ে দিনে চার পাঁচটা গান গাইছেন আশা৷
১৯৪০-১৯৫০ এই সময়ের মধ্যেই আশা ভোসলে প্রায় ৮০০ গান রেকর্ড করেন৷ যদিও এই সব গান শিল্পী হিসাবে তাঁকে প্রতিষ্ঠা দেয়নি। তখন সঙ্গীত পরিচালকদের প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিলেন দিদি লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্তের মত উজ্জ্বল নক্ষত্ররা । এঁরা গাইতে রাজি না হলে তখন সুযোগ পেতেন অথবা বি গ্রেড, সি গ্রেড ছবিতে আসত গানের সুযোগ।কোনওকিচুতেই ‘না’ ছিলনা আশার। তাঁর এই কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছিলেন ওপি নাইয়ারকে৷ সিআইডি ছবিতে গান গাওয়ার সুযোগ দিলেন৷ এই ছবির গান জনপ্রিয় হল৷ এরপর ‘নয়া দওর’ ছবিতে প্রথমবার নায়িকার কণ্ঠে সমস্ত গান গাইলেন আশা ভোঁসলে৷ এই ছবিই ভাগ্য বদলে দিল আশার৷ ভারতীয় সঙ্গীত পেল এক নতুন জুটি ওপি নাইয়ার-আশা ভোঁসলে। আইয়ে মেহেরবান, দিওয়ানা হুয়া বাদল, কাজরা মহব্বতওয়ালা একের পির এক হিট গান উপহার দিলেন ওপি-আশা জুটি৷
তখন কেরিয়ারের গ্রাফ আসতে আসতে ওপরে উঠতে শুরু করেছে। সেই সময় আচমকা ১৯৫৯ সালে গণপত রাও একদিন মধ্যরাতে মারধর অত্যাচার করে অন্তঃসত্ত্বা আশা দুই সন্তান সহ বাড়ি থেকে বার করে দিলেন৷ অসহায় আশা ফিরে গেলেন মঙ্গেশকর পরিবারে৷ ১৯৬০ সালে বিচ্ছেদ হল গণপত রাওয়ের সঙ্গে। বিচ্ছেদের পরে পুনরায় প্রেম এল আশার জীবনে৷ ওপি নাইয়ারের সঙ্গে আশা ভোসলের সম্পর্কের কথা জেনে গিয়েছিলেন লতা মঙ্গেশকর৷ ওপি নাইয়ার তখন বিবাহিত এবং চার সন্তানের পিতা৷ আশা ভোঁসলে সেই সময় ওপি নাইয়ারের সঙ্গে লিভ ইন সম্পর্কে ছিলেন। দিদি লতা কিছুতেই এই সিদ্ধান্ত মানতে পারেননি৷ ফের দূরত্ব বাড়ল দুই বোনের৷ ১৪ বছর সম্পর্কে ছিলেন আশা আর ওপি নাইয়ার৷ কিন্তু ওপি নাইয়ারের বিচ্ছেদ না হওয়ায় তাঁরা কখনও বিয়ে করেননি৷ ওপি নাইয়ারের সন্তান বড় হওয়ার পর সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় দূরত্ব বাড়লেন আশার সঙ্গে।
একটা সময় বলিউডে রয়্যালটি বিবাদ শুরু হল৷ একদল লতা মঙ্গেশকর, অন্যদল মহম্মদ রফি। এই দলাদলিতে আশা ভোঁসলে মহম্মদ রফির দলে ভিড়লেন৷ দুই বোনের মধ্যে সম্পর্কে আরও ফাটল ধরল৷ শচীন দেব বর্মনের সঙ্গেও সেই সময় লতা মঙ্গেশকরের বিবাদ হওয়ায় লতার গাওয়ার কথা যে সব গান সেই সমস্ত গান শচীন দেব বর্মন গাওয়ালেন আশাকে দিয়ে৷ ছোড় দো আঁচল, হাল ক্যায়সা হ্যায়, রাত আকেলি হ্যায়, আচ্ছা জি ম্যায় হারই চলো একের পর এক হিট গানে আশা ভোঁসলে মন জিতে নিলেন শ্রোতাদের৷ ১৯৬৫ সালে শচীন দেব বর্মন একটি গান গাইতে বললেন আশাকে৷ তার জন্য রাহুল দেব বর্মনকে পাঠালেন আশা ভোঁসলের কাছে৷ যদিও এর আগেই রাহুল দেব বর্মন দেখেছেন আশাকে৷ যদিও সেই সময় আশা তেমন পছন্দ করতেন না রাহুল দেব বর্মনকে৷ ১৯৬৬ সালে রাহুল দেব বর্মন ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছবির জন্য গান গাওয়ালেন আশা ভোসলেকে৷ ও মেরে সোনা রে সোনা, আজা আজা ম্যায় হু প্যায়ার তেরা, ও হাসিনা জুলফো বালে জানে যাঁহা-র মত গানগুলি রাতারাতি সুপারহিট হয়ে যায়৷ এই ছবিতে গান গাওয়ার পর থেকেই আশা ভোঁসলে রাহুল দেব বর্মনের বহুমুখী সঙ্গীত প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলেন। আশা ভোসলে রাহুল দেব বর্মন- একের পর এক নতুন সুপারহিট গান উপহার দিতে থাকলেন৷ ভারতীয় সঙ্গীতের ধারায় এল পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অনুরণন, সুরের ছোঁয়ায় রঙ লাগল দু’জনের মনে। এদিকে ওপি নাইয়ারের সঙ্গে দূরত্ব বাড়লেও বিচ্ছেদের কথা ভাবেননি আশা কিন্তু একদিন আবেগের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে ওপি নাইয়ার আশার মেয়ে বর্ষাকে মারতে উদ্যত হলে আশা ওপি নাইয়ারের সম্পর্কের শেষ হল৷
অন্যদিকে সুরে সুরে কখন যেন রাহুল দেব বর্মন মন দিয়ে ফেললেন আশাকে৷ রাহুল দেব বর্মন বিয়ের প্রস্তাব দিলেন আশাকে৷ তবে বিয়ে নামক বিভীষিকা থেকে দূরে থাকতেই চান আশা৷ কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা ভোসলে বুঝলেন রাহুল দেব বর্মনের ভালবাসা কতটা গভীর৷ দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষা করেছিলেন রাহুল দেব বর্মন৷ বিয়ে করলে আশাকেই করবেন, রাহুল দেব বর্মনের এই জেদের প্রতিই আস্থা রাখলেন আশা৷ ১৯৮০ সালে রাহুল দেব বর্মন আর আশা ভোসলে বিয়ে করেন৷ তখনকার দিনে বিবাহবিচ্ছিন্না, তিন বাচ্চার মা, তার থেকে ৬ বছরের ছোট ছেলেকে বিয়ে করে সাহসি ও উন্নত মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন আশা-রাহুল জুটি৷ এই বিয়েই খুশি এনে দিল আশার জীবনে৷ তাদের সম্পর্কের ভিত ছিল সঙ্গীত।আশার জীবনে একরাশ আলো নিয়ে এসেছিলেন রাহুলদেব বর্মন। ‘পিয়া তু অব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘মেরা কুছ সামান’-এর মতো হিন্দি গানের পাশাপাশি ‘মহুয়া জমেছে আজ’, ‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘চোখে নামে বৃষ্টি’র মতো বহু বাংলা গান সঙ্গীতপ্রেমীদের উপহার দিয়েছিলেন রাহুল-আশা জুটি। কিন্তু ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিক থেকে গানের ধারা কিছুটা বদলে গেল৷ বদলের সঙ্গে ততটা খাপ খাওয়াতে পারলেন না রাহুল দেব বর্মন। গান কমতে লাগল অবসাদে ডুবে যাওয়া রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গী হল মদ৷ আশা রাহুলের সম্পর্কের অবনতি হল। ১৯৯৩ সালে রাহুল দেব বর্মন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন৷ পঞ্চম সুর মুছে গেল আশার জীবন থেকে৷ আশা ভোঁসলের জীবনে আবারও অন্ধকার নেমে এল। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুর আঘাত এত তীব্র ছিল যে গান থেকে দূরে সরে যেতে লাগলেন আশা৷ তবে নতুন ভাবে ফিরে এলেন এ আর রহমানের গানের মাধ্যমে৷ রঙ্গিলা, তনহা তনহা গাইলেন ৭০ বছর বয়সে৷ যখন সকলে ভাবলেন এবার আশা ভোঁসলে অবসর নেবেন তখন তিনি নতুন ভাবে ফিরলেন কাম্বাক্ত ইস্ক এর মতো গান গেয়ে৷ কিন্তু লড়াই যতই করুন, দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি আশার৷ ২০১২ সালে আত্মহত্যা করলেন আশা ভোঁসলের মেয়ে বর্ষা৷ ২০১৫ সালে ক্যানসারে মারা গেলেন আশা ভোঁসলের বড় ছেলে হেমন্ত ভোঁসলে৷
নিজের পরিচয় তৈরি করতে ভেঙেছিলেন নিজেকে৷ ইংরাজি গান ইংরাজি সিনেমা দেখার অভ্যাস শুরু করেন৷ ভারতীয় গানে সুর সোজা লাগানো হয়৷ পাশ্চাত্য প্রভাব নিয়ে গাইতে শুরু করলেন ভারতীয় গান৷ ইনা মিনা ডিকা গাওয়ার পর তাঁর গান নিয়ে কটাক্ষ শুরু হয়৷ পাশ্চাত্যের গানে এই ধরনের সুর ভাল লাগলেও ভারতীয় গান এমন হতে পারে না৷ এই দাবি উঠলেও তিনি ভেঙে পড়েননি, দমে যাননি৷ ওই যে, না শব্দ তার ডিকশিনারিতে নেই। তাই গায়কী বদলালে কটাক্ষ যতই আসুক, নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকলেন আশা৷ আর সেই দৃ়ঢ়তা তাকেই নানা প্রতিকুলতার মধ্যে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তার রত্নময় সঙ্গীত প্রতিভা পরিপূর্ণ করেছে ভারতীয় সুরের ভাণ্ডার। গায়িকার প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সঙ্গীতপ্রেমীরা। সুর থামলেও আশাজির গান অমর হয়ে থাকবে সঙ্গীত জগতে।