হরমুজে ক্ষুব্ধ চিন ! ট্রাম্পকে হুঁশিয়ারি !

চিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডং জুন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বেজিং শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : পশ্চিম এশিয়ায় নীল জলরেখা হরমুজ প্রণালী যেখানে প্রতিদিন অগণিত জাহাজ পেরিয়ে যায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণস্রোত বহন করে। সেখানেই এবার জমাট বেঁধেছে নতুন এক যুদ্ধ। তেলের ট্যাঙ্কার, যুদ্ধজাহাজ আর নজরদারি মিলিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে ফের তীব্র হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ইরানের বন্দর ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অবরোধমূলক অবস্থান নেওয়ায় শুধু তেহরান নয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বেজিংও। আর সেই সুর এতটাই কড়া যে বিশ্ব রাজনীতির পারদ আবারও চড়তে শুরু করেছে। ফলে গোটা পরিস্থিতি এখন খুবই জটিল অবস্থায় দাঁড়িয়ে বলাই যায়।

এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে গত কয়েকদিনে। যখন মার্কিন সেনার সেন্ট্রাল কমান্ড ঘোষণা করে তারা ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলে নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়াবে। তাদের দাবি, অবৈধভাবে শুল্ক প্রদানকারী যে কোনও জাহাজকে আটক করা হবে। এমনকি কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয় ইরান বা তার সবযোগীরা যদি মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানে তবে তার জবাব হবে কঠোর। এই ঘোষণার পরই বাস্তবে প্রভাব পড়তে শুরু করে। একটি চিনা জাহাজকে মাঝপথ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে বলে খবর সামনে আসে। এই ঘটনাই বেজিংয়ের অসন্তোষকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। চিনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডং জুন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, বেজিং শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। তবে ইরানের সঙ্গে তাদের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও বহিরাগত হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। এই বক্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে চিনের স্পষ্ট অবস্থান। তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপকে মেনে নিতে রাজি নয়।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে চিন তার প্রায় ৪০ শতাংশ তেল এবং ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানি করে। ফলে এই পথ ব্যাহত হলে সরাসরি ধাক্কা খায় তাদের অর্থনীতি। ইরানের উপর চাপ বাড়াতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ চিনের জ্বালানি নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই এটাকে কূটনৈতিকভাবে নেওয়া ছাড়া বেজিংয়ের সামনে আর কোনও বিকল্প নেই। শুধু চিন নয় এই ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আরও বেশ কয়েকটি দেশ। স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রোব্লেস মার্কিন অবরোধকে অযৌক্তিক ও বেআইনি বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। এই সুর শোনা গেছে অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনের নেতৃত্বের কাছ থেকেও। তারা মনে করছে হরমুজের মতো একটি আন্তর্জাতিক জলপথ কোনও একক দেশের নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে উঠলে তার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের উপর। অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিতে ছাড়েনি। তেহরানের তরফে জানানো হয়েছে যদি তাদের বন্দর বা উপকূলীয় অঞ্চলকে লক্ষ্য করে কোনও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের কোনও বন্দরই নিরাপদ থাকবে না। এই বক্তব্য শুধু প্রতিরোধের বার্তা নয়, বরং একপ্রকার সতর্কতা যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তা সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই পরিস্থিতির পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট রয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তানে হওয়া শান্তি বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আর্থিকভাবে চাপে ফেলতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই এই অবরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এর ফলে যে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী এখন শুধুমাত্র একটি সামুদ্রিক পথ নয়। এটি হয়ে উঠেছে বিশ্ব শক্তির টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ , প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তেলের দাম থেকে শুরু করে বাণিজ্য, কূটনীতি থেকে সামরিক ভারসাম্য সবকিছুই যেন এই একটি জলপথের সঙ্গে আঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গেছে।