গত সপ্তাহের ইসলামাবাদ বৈঠকেই মূল আলোচ্য বিষয়গুলি প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছে গিয়েছিল দুদেশ।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আবহ এখনও উত্তাল। সংঘাতের পর আলোচনার টেবিলে ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে বিশ্বের দুই প্রভাবশালী শক্তি আমেরিকা ও ইরান। এখানেই এবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ চায় দুই দেশের দ্বিতীয় দফার বৈঠকও তাদের মাটিতে অনুষ্ঠিত হোক। যেন তারা মধ্যস্থতার এই প্রক্রিয়াকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সূত্রের খবর, তারা ইতিমধ্যেই এই প্রস্তাব পাঠিয়েছে উভয় দেশের কাছে যদিও ওয়াশিংটন বা তেহরান এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়নি। পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা কাটাতে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা শুরু করেছে ইসলামাবাদ। আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার প্রাথমিক পর্ব থেকেই মধ্যস্থতা করছে পাকিস্তান। আমেরিকাও তাদের শর্তাবলি পাকিস্তান মারফতই পাঠিয়েছিল ইরানকে। গত সপ্তাহে আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেরও আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু সেই বৈঠক ভেস্তে গিয়েছে। ইসলামাবাদের হোটেলে প্রায় ২০ ঘণ্টা আলোচনা চলার পর কোনও সমাধানসূত্র ছাড়াই শেষ হয় বৈঠক।
এরই মধ্যে ফের আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একপ্রস্ত আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, গত সপ্তাহের ইসলামাবাদ বৈঠকেই মূল আলোচ্য বিষয়গুলি প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছে গিয়েছিল দুদেশ। তবে বাকি অংশটুকু নিয়ে কোনও তাৎক্ষণিক সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসেনি। এরই মধ্যে মঙ্গলবার সকালে মার্কিন আধিকারিক সূত্রে এপি জানায়, বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসতে পারে দুই দেশ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তান আবারও নিজেদের প্রস্তাব সামনে এনেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পাক আধিকারিক জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফার বৈঠক ইসলামাবাদে আয়োজনের ব্যাপারে আগ্রহী। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আমেরিকা ও ইরান অন্য কোনও নিরপেক্ষ স্থানে আলোচনায় বসতে চায় কি না তার ওপর। তাদের মতে, প্রথম বৈঠক ফলপ্রসূ না হলেও সেটি ছিল বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, খুব শিগগিরি এই আলোচনা আবার শুরু হতে পারে। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন আগামী দুই দিনের মধ্যে কিছু একটা ঘটতে পারে এবং পাকিস্তানে গিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এর আগে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সও ছিলেন। যদিও সেই বৈঠক কোনও চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জানা যায় ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে বার্তা বিনিময় হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনায় বসার বিষয়ে এখনও কোনও নিশ্চিত সম্মতি পাওয়া যায়নি। আমেরিকা-ইজরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের ফলে তেলের যে হারে দাম বেড়েছে তা তো গোটা বিশ্বই দেখেছে। পাকিস্তানের পেট্রোলের দাম পাক রূপি ৪৫৮ লিটার ও ডিজেল ৫২০ লিটার পাক রূপি। ইরান থেকে পাকিস্তানে আসার যে তেলের আমদানিতেও ক্ষতি হয়েছে। এখানে একটা বিষয় আছে পাকিস্তান ইরান থেকে তেল কেনেই না। শেষবার ২০০৯ সালে পাকিস্তান ইরান থেকে তেল কিনেছিল। অবশ্য পাকিস্তান সরকার ইরান থেকে তেল কেনে না তেল কেনে পাকিস্তানের মানুষ। বালুচিস্তানের মতো অঞ্চলে জীবিকা মানেই ইরানি তেল পাচার। কীভাবে এই পাচার নেটওয়ার্ক কাজ করে? কারা এর সঙ্গে জড়িত? কেন এটি বন্ধ করা এত কঠিন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই অবৈধ বাণিজ্য শুধুমাত্র একটি অপরাধমূলক কার্যকলাপ নয়। বরং হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার উপায়ে পরিণত হয়েছে। ইরানে ভর্তুকির কারণে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম অত্যন্ত কম আর সেই জ্বালানি পাকিস্তানে এনে বেশি দামে বিক্রি করা যায়। এই দামের ব্যবধানই তৈরি করেছে একটি বিশাল পাচারচক্র। সূ্ত্রে খবর, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি লিটার ইরানি পেট্রোল ও ডিজেল পাকিস্তানে পাচার হয়। যা দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের জ্বালানি এইভাবে অবৈধভাবে প্রবেশ করে। বালুচিস্তানের প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ সরাসরি এই পাচার অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইরান-পাকিস্তান সীমান্তের বহু অংশই অরক্ষিত এবং নিয়ন্ত্রহীন। যা এই পাচারকে আরও সহজ করে তুলেছে। পাকিস্তান সরকারের কাছে খবর থাকলেও তারা এর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি।