প্রথম দফার ভোটে হেভিওয়েটদের মধ্যে কেউ কেউ বেশ চাপে রইলেন। তবে কি আভাস বুঝেই ময়দানে নেমে ভোট করাতে হল শুভেন্দু অধিকারী, অগ্নিমিত্রাদের ?
স্বাগতা চন্দ্র সাহা, সাংবাদিক : মোদী বলছেন পাল্টানো দরকার। মোদীজীর সুরে বিজেপি নেতা নেত্রীরাও একই কথা বলছেন। যে করেই হোক বাংলা দখল করতে হবে। প্রথম দফার ভোটে সেই ছবি ধরা পড়ল। ময়দানে দৌড়ঝাঁপ করে ভোটের হাওয়া গরম রাখলেন শুভেন্দু অধিকারী থেকে অগ্নিমিত্রা পালরা। উল্টো ছবি ধরা পড়ল শাসক দলে। নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর পর যার দিকে বেশি নজর সেই তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র কর সাদা শার্ট পড়ে শান্ত ভাবেই ভোট পরিচালনা করলেন। যে কেষ্ট কথনে বাংলার ভোট জমে থাকতো সেই অনুব্রত মণ্ডল আবার কুল থাকার পরামর্শ দিয়ে শান্তিতে ভোট দিলেন। অন্যদিকে মুর্শিদাবাদে দৌড়ে বেরিয়ে খবরের শিরোনামে এলেন হুমায়ুন কবীর। দিলীপ ঘোষ আবার ভোট দিয়ে বিশ্রামের কথা বলে যেন বেশি শান্ত হয়েই রইলেন। প্রথমদফার ভোট দেখে কী মনে হচ্ছে। হাওয়া কোন দিকে বইছে। যাই বলুন না প্রথমদফার ভোটে হেভিওয়েটদের মধ্যে কেউ কেউ হেভি চাপে রইলেন। তবে কি আভাস বুঝেই ময়দানে নেমে ভোট করাতে হল শুভেন্দু অধিকারী, অগ্নিমিত্রাদের?

প্রথম দফার ভোটে বিশেষ নজর ছিল নন্দীগ্রামে। শুভেন্দু গড় বলে কথা। বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী থেকে তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করের লড়াইয়ে হিট নন্দীগ্রাম। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি এই নন্দীগ্রামে কেউ দাঁত ফোটাতে পারবে না। এই বাংলার রাজনীতিতে নন্দীগ্রাম যেন আলাদাই ভূখন্ড। যেখানে প্রবল মমতা হাওয়াও দিকভ্রষ্ট। ভোট শুরু হতেই ময়দানে নেমে পড়েন শুভেন্দু অধিকারী। কোথাও যেন এতটুকু গলদ না হয় তার জন্য বুথে বুথে টহল দিয়ে বেড়ান তিনি। শুনতে হয়েছে জয় বাংলা ধ্বনি। যদিও শুভেন্দু অধিকারীর দাবি বুথে বুথে ঘুরে গুণ্ডাদের বোতলবন্দী করে দিয়েছেন।

অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী যখন বুথে বুথে ঘুরে টহল দিয়ে বেরালেন তখন একটু বেশিই শান্ত থাকতে দেখা গেল পবিত্র করকে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। তাঁর দাবি কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটে বিজেপির হয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর মতো ময়দানে নেমে ভোট করেন অগ্নিমিত্রা পাল। আসানসোল দক্ষিণের এই বিজেপি প্রার্থী পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন। প্রার্থীর সঙ্গে গাড়ির সংখ্যা নিয়ে বচসা বাধে। এখানেই শেষ নয়,অগ্নিমিত্রা পালের গাড়িতেও হামলা চলে হীরাপুরে। এমনটাই অভিযোগে সরব হন প্রার্থী নিজে। ইঁটের আঘাতে গাড়ির কাচ ভাঙে বলে অভিযোগ। এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। অগ্নিমিত্রা পালকে যতটা দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা গেল ততটাই শান্ত ছিলেন তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অন্যান্য প্রার্থী। অগ্নিমিত্রা পাল যেন বুথরক্ষা করে গেলেন। কেন হবে না বা কেন, তৃণমূল প্রার্থী তাপস চট্টোপাধ্যায়তো দক্ষ সংগঠক। আসানসোল দক্ষিণ তৈরির পর থেকে এখনও পর্যন্ত তিনটি বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। প্রথম দুটিতে দাপট দেখিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১১ এবং ২০১৬- দুবারই জয়ী হন তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস রণকৌশল বদলে তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে রানিগঞ্জ আসনে পাঠায়। তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় রানিগঞ্জে জেতেন। কিন্তু তৃণমূলকে হারাতে হয় আসানসোল দক্ষিণ আসনটি।

গেরুয়া শিবিরের শুভেন্দু, অগ্নিমিত্রাকে যতটা অ্যাকটিভি দেখা গেল ততটাই শান্ত মেজাজে ক্য়ামেরার সামনে ধরা দেন দিলীপ ঘোষ। সকাল সকাল ভোট দেন খড়গপুর সদরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। দিনভর খড়গপুরেই ছিলেন তিনি। তবে তাঁকে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী লাগছিল। বুথে বুথে ঘোরার কোনও দরকার নেই শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এবার আসি হুমায়ুন কবীর প্রসঙ্গে। নিজেকে মুখ্যমন্ত্রী মুখ বলা হুমায়ুন কবীর কেমন যেন ঘেঁটে রইলেন ভোট চলাকালীন। আমজনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী হুমায়ুন কবীরকে লক্ষ্য করে হামলা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সামনে। তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয় লাঠি, বাঁশ দিয়ে। তৃণমূল কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতি হয় হুমায়ুনের সমর্থকদের । হুমায়ুন কবীরের উদ্দেশে ‘চোর চোর’ স্লোগান দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। তৃণমূলের অভিযোগ, তৃণমূল প্রার্থী সাহিনা মমতাজ খানের উপরে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছে হুমায়ুনের দল। পালটা হুমায়ুনদের দাবি, তৃণমূল তাদের উপরে হামলা চালিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। নতুন দল ঘোষণার পর থেকে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে। কখনও ভিডিও ফুটেজ লিক কখনও জোটসঙ্গীর সঙ্গ ত্যাগ। এরপরেও লেগে রয়েছে তাঁর দলের ভাঙন। সবমিলিয়ে হুমায়ুন কবীর যেন ভোট ময়দানে ছন্নছাড়া ভাবেই ঘুরে মরলেন। যদিও তাঁর এখন লক্ষ্য ১৮২ নয় নওদা ও রেজিনগর আসনটি রক্ষা করা।

অধীররঞ্জন চৌধুরীও ভোট ময়দানে। দীর্ঘ দুই দশক পর তিনি আবার বিধানসভায় প্রার্থী। বহরমপুর আসনে তিনি কংগ্রেস প্রার্থী। সকাল সকাল বুথে গিয়ে ভোট দেন অধীর চৌধুরী। তিনিও এদিন যথেষ্টই শান্ত ছিলেন। এমনিতেই তিনি জেতার ব্যাপারে আশাবাদী। এখন দেখার লোকসভা ভোটে হারের পর বহরমপুরের মানুষ কতটা সমর্থনের হাত বাড়ান তাঁর দিকে। অন্যদিকে বাংলায় ভোট চলছে অথচ একেবারে শান্ত মেজাজেই ধরা দিলেন অনুব্রত। যে কিনা ভোট এলেই চমকানি, হুঁশিয়ারিতে যিনি খবরের শিরোনামে থাকতেন তিনিই বলছেন মাথা ঠান্ডা রাখার কথা। আজব সব ব্যাপার স্যাপার। বাংলা জিততে কতটা যে মরণ কামড় দেওয়া যায় তা বিজেপিকে দেখলে বোঝা যায়। বাংলায় যখন প্রথম দফা ভোট চলছে তখন দ্বিতীয় দফার ভোট প্রচারে নরেন্দ্র মোদী, ওয়ার রুম সামালচ্ছেন খোদ অমিত শাহ। সল্টলেক পার্টি অফিসে খোলা হয়েছে ওয়ার রুম সেখানেই বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ভোট পর্যবেক্ষণ করেন শাহ। অতএব বোঝায় যাচ্ছে এবার ভোট কতটা চ্যালেঞ্জ দুই শিবিরের কাছে।