রাইটার্সে বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী কে?

নীরবতা মানেই গুরুত্ব হারানো নয়। সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ চলেছে এই ঐতিহাসিক ভবনে।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ব্রিটিশদের বিদায়ের পর অনেক ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে এই ভবন। ইতিহাস, প্রশাসন আর ক্ষমতার কেন্দ্র। এই তিনের মিলনেই তৈরি এই বিল্ডিং। লাল ইটের সেই ঐতিহ্যবাহী ভবন। যার করিডোরে একসময় গড়ে উঠত বাংলার প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর। দীর্ঘ সময় ধরে এই ভবনই ছিল রাজ্যের শাসনকেন্দ্র। এখান থেকেই চালিত হত সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, তৈরি হত নীতিনির্ধারণের খসড়া। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে প্রশাসনিক কাঠামো। নিরাপত্তা ও পরিকাঠামোগত কারণে প্রশাসনের কাজকর্ম সরে যায় অন্যত্র। ফলে একদা কর্মচঞ্চল মহাকরণ আজ অনেকটাই নীরব। নীরবতা মানেই গুরুত্ব হারানো নয়। সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ চলেছে এই ঐতিহাসিক ভবনে। পরিকল্পনা রয়েছে, নতুন রূপে ফিরবে এই ভবন। ঐতিহ্যকে বজায় রেখে আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে ফের ফিরতে চলেছে মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিং।

একসময় কেরানিরা এখানে বসে কাজ করতেন, তাই নাম হয় মহাকরণ। কেরানিদের বলা হত রাইটার, তাই ব্রিটিশদের তৈরি সেই ভবনের নাম হয়ে যায় রাইটারস বিল্ডিং। ব্রিটিশদের বিদায়ের পর অনেক ইতিহাসের সাক্ষী থেকেছে কলকাতার এই ভবন। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর লালবাড়ি থেকে প্রশাসন সরেছে নীলবাড়িতে। মমতা ক্ষমতায় আসার পর মহাকরণে কাজ শুরু করলেও পরে ছেড়ে চলে যান নবান্নে। বলে গিয়েছিলেন, ছমাসের মধ্যেই ফিরে আসছেন। ২০১৩-এর ৫ অক্টোবর ছিল সেটা। তারপরে কেটে গিয়েছে এক দশকের বেশি সময়। গত কয়েক বছর ধরেই চলেছে সংস্কারের কাজ। ১০২ কোটি টাকার এই সংস্কার প্রকল্পে ভবনের পুরনো কাঠামো সংরক্ষণ করে আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। যদিও এখনও ভবনের কিছু অংশে মেরামতির কাজ বাকি রয়েছে। তবুও মূল ব্লকের বড় অংশ এখন ব্যবহারের উপযোগী হয়ে উঠেছে।

একটা সময় এখান থেকেই রাজ্য চালিয়েছিলেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীরা। ১৯৪৭থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত এই ভবন থেকে প্রশাসনের দায়িত্ব সামলেছেন প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৪৮-র ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৬০ দিন দায়িত্বভার সামলেছেন তিনি। এর পরে ১৯৪৮-র ২৩ জানুয়ারি থেকে ১৯৫০-র ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মহাকরণ থেকে দায়িত্বভার সামলান ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। মানে এই ভবন থেকে মোট ২ বছর ২ দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব সেরেছেন তিনি। এরপর ১৯৫০ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বউবাজার কেন্দ্র থেকে জিতে ফের রাইটার্সে বসেন তিনি। ডঃ বিধান চন্দ্র রায় ১৯৪৮থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত এই ভবনেই বসতেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন । মোট ৪ বছর ২৩৪ দিন এই ভবনে থকে দায়িত্ব সামলান তিনি। এরপর কুর্সিতে বসেন অজয় কুমার মুখোপাধ্যায়। ২৬৫ দিন তাঁর কাজ চলেছেন এই ভবন থেকে। তারপর ফের কুর্সিতে বসেন প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ। পরে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, জ্যোতি বসু এই মহাকরণ থেকেই প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলেছেন। বুদ্ধদেব বাবুও ২০১১ সাল পর্যন্ত এই রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বসেই বাংলা পরিচালনা করতেন। তারপরে রাজ্য ঘটে পালাবদল। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দু বছরের বেশি সময় এই ভবন থেকেই কাজ সামলেছেন। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রশাসনিক কাজকর্ম রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে হাওড়ার ‘নবান্ন’তে স্থানান্তর করা হয়। মানে লালবাড়ি থেকে প্রশাসন সরে নীলবাড়িতে। তারপর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য পরিচালনা করতেন গঙ্গার অন্যপাড় নবান্ন থেকে।

পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সদর দফতর কোথায় হবে, তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে রাইটার্স বিল্ডিং। রাইটার্স বিল্ডিং পরিদর্শনে যায় পূর্ত দফতরের এক টিম। জানা যায়, ভবনের দ্বিতীয় তলাকেই সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রীর দফতর হিসেবে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে। এবার ফের মহাকরণের ফাঁকা করিডরে শোনা যেতে পারে পায়ের শব্দ। ইতিমধ্যেই দ্বিতীয় তলার সংস্কার ও মেঝে তৈরির কাজ অনেকটাই শেষ হয়েছে। বাকি রয়েছে মূলত অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ফিনিশিংয়ের কাজ।

২৫ বৈশাখ বাংলার নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেবেন। বিজেপি সরকার গঠন করবে রাজ্যে। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। অন্যদিকে মহাকরণে শুরু জোর প্রস্তুতি। বঙ্গ বিজেপি নেতৃত্ব জানায়, রাইটার্স বিল্ডিং ওরফে মহাকরণ থেকে এবার বাংলা পরিচালনা হবে। মুখ্যমন্ত্রীর ঘর মহাকরণের কোথায় হবে? অন্যান্য মন্ত্রীরা কোথায় বসবেন? সেসব বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। যেহেতু এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় তলার সংস্কার ও মেঝে তৈরির কাজ অনেকটাই শেষ হয়েছে তাই এই তলাতেই মুখ্যমন্ত্রীর দফতর হওয়ার সম্ভাবনা তুঙ্গে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দফতর ছিল প্রথম তলায়। তবে সেই তলার সংস্কার কাজ এখনও পিছিয়ে রয়েছে। তুলনায় দ্বিতীয় তলার কাজ অনেকটাই এগিয়ে।

মহাকরণ তাই শুধু একটা ভবন নয়। এটা বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসের প্রতীক। সময়ের সঙ্গে তার ভূমিকা বদলেছে ঠিকই, কিন্তু গুরুত্ব আজও অটুট। অতীতের ঐতিহ্য আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে সঙ্গে নিয়েই নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায় মহাকরণ। এখন সব নজর সেই ঐতিহাসিক লালবাড়ির দিকে। দীর্ঘদিনের নীরবতা কাটিয়ে সত্যিই কি আবার প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে মহাকরণ? নতুন সরকারের হাত ধরে কি ফিরবে পুরনো ঐতিহ্যের সেই দিন? প্রশ্ন অনেক, জল্পনাও তুঙ্গে। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট। বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে মহাকরণের গুরুত্ব কখনও ম্লান হয়নি, আর সময়ই বলবে, অতীতের সেই গৌরব নিয়ে ঠিক কতটা জোরে ফের মঞ্চে ফিরতে পারে এই ঐতিহাসিক ভবন।