টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রি, বিস্ফোরক বিবৃতি দেবের

বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই নিজের অবস্থান নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেতা।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : ১৫ বছরের তৃণমূলের শাসনের অবসান। দল হারতেই তৃণমূলের অন্দরে একের পর এক ফাটলের শব্দ। ৪ মে ভোটের ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যে ছবিটা সামনে আসতে শুরু করেছে তাতে স্পষ্ট পরাজয়ের ধাক্কায় শুধু সরকারই বদলায়নি বদলে যাচ্ছে সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সমীকরণও। কেউ রাজনীতি ছাড়ছেন, কেউ দলের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন। আবার কেউ নেতৃত্বকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন। এই পালাবদলের আবহে নতুন বার্তা দিলেন সুপারস্টার দেব। তিনি বললেন রাজনীতিতে আর জড়াতে চান না। অভিনয় নিয়েই থাকবেন। ২০১৪ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে রাজনৈতিক জীবনে অভিষেক হয়েছিল দেবের। তারপর দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ঘাটালের সাংসদ হিসেবে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেন তিনি। এই বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই নিজের অবস্থান নিয়ে মুখ খুললেন অভিনেতা।

সমাজমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে নতুন সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়ে দেব লেখেন, বাংলার মানুষ যে রায় দিয়েছেন তাকে সম্মান জানানোই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন নতুন সরকার রাজ্যের শান্তি, উন্নয়ন ও মানুষের আওয়াজকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। তবে শুধু রাজনীতি নয়, বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প নিয়েও নিজের গভীর উদ্বেগ ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন দেব। তাঁর কথায় বাংলা সিনেমার ভিত আরও শক্ত হোক। কারণ চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, বাংলা সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অন্যতম মুখ। ঘাটালের দীর্ঘদিনের বন্যার সমস্যার কথাও ভুলে যাননি দেব। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য নতুন সরকার বিজেপির সহযোগিতা চেয়েছেন। এর পাশাপাশি বাংলা ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের নানা অস্বস্তিকর বাস্তবতা নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি। দেবের বক্তব্য, এমন একটা সময় আসা উচিত যখন কাউকে আর ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যান করার সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হবে না। প্রযোজকদের ওপর অযথা নিয়মের চাপ থাকবে না। সুস্থ পরিবেশে কাজ হবে। সবশেষে তিনি রাজনীতিতে আর বেশি জড়াতে চাননা। আগের মতো মন দিয়েই অভিনয় করতে চাই বলে জানান সাংসদ দেব। দলের পরাজয় তাঁকে কষ্ট দিলেও বাংলার এই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তিনি ইতিবাচক ভাবেই দেখছেন। এরই মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এক ভিডিও ঘিরে চর্চার কেন্দ্রে দেব। ভিডিওতে দেখা যায় একটি সভা থেকে হাত জোড় করে বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নেপথ্যে চোর চোর স্লোগান শোনা যাচ্ছে বলে দাবি করে তা ভাইরাল করা হয়। এরপরই শুরু হয় কটাক্ষ। তবে এবার নিজেই সেই ভিডিওর আসল সংস্করণ শেয়ার করলেন দেব। তাঁর দাবি ভিডিওটি বিকৃত ও এডিটেড। সেখানে কোনও চোর স্লোগান নেই বরং সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাসই শোনা যাচ্ছে। অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা করে তিনি সকলকে বিভ্রান্তিকর ভিডিওতে বিশ্বাস না করার আবেদন জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, সমাজমাধ্যমে বড় সিদ্ধান্তের কথা জানান পরিচালক ও প্রাক্তন বিধায়ক রাজ চক্রবর্তী। ২০২৬-এর নির্বাচনেই শেষ হল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পথচলা। ব্যারাকপুরে ভোটের আগে রাজ চক্রবর্তীর রোড শো ঘিরে ছিল উন্মাদনা। তৃণমূলের প্রার্থীকে মালা পরিয়ে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় মানুষ। কিন্তু ফল ঘোষণার পর সেই ছবিটাই যেন উল্টে গেল। গণনাকেন্দ্রে ছাড়ার সময় চোর চোর স্লোগান, কাদা ও চটি ছোড়ার মতো অপ্রীতিকর ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় পরিচালক-প্রাক্তন বিধায়ককে। তবুও সংযত ছিলেন রাজ। হাসিমুখেই এলাকা ছাড়েন তিনি। তিনি জানিয়ে দেন, জীবনে দায়িত্ব পেলেই তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করেছেন। পরিচালক হিসেবে যেমন সাফল্য-ব্যর্থতা এসেছে রাজনীতিতেও তেমনই জয় পরাজয় রয়েছে। ২০২১ সালে মানুষের দেওয়া সুযোগকে সম্মান জানিয়ে পাঁচ বছর বিধায়কের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছিলেন বলেো উল্লেখ করেন রাজ। নতুন সরকারকেও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাজ। বাংলার উন্নতি ও মানুষের মঙ্গল কামনা করে তিনি জানান, গণতন্ত্রে মানুষের মতামতই শেষ কথা। তবে রাজনীতিকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্কও। পরিচালক ও নাট্যব্যক্তিত্ব সৌরভ পালোধি নাম না করেই সমাজমাধ্যমে কটাক্ষ করেন হেরে গেলে রাজনৈতিক জীবন শেষ হয়ে যায়? তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে শুরু হয় জোর চর্চা।

২০১৪ থেকে তারকাপ্রথাকে হাতিয়াj করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মুনমুন সেন থেকে দেব, নুসরত জাহান প্রায় গোটা টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকেই রাজনীতির ময়দানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সায়ন্তিকা অনেক দিনই অভিনয় থেকে অনেক দূরে। লাভলি মৈত্র বা অদিতির জনপ্রিয়তা থাকলেও সেই জনপ্রিয়তা কাজে আসেনি এই ২৬-এ বিধানসভা নির্বাচনে। অবশ্য তৃণমূলের দেখাদেখি তারকাপ্রথায় ভেসেছিল বিজেপিও। শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, পার্নো মিত্র, পায়েল সরকারকে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে দাঁড় করিয়েছিল। সেই নির্বাচনে প্রথমবার বিজেপির হয়ে লড়েছিলেন রুদ্রনীল ঘোষ। সেইবার হারের মুখ দেখলেও দল ছাড়েননি। এবারে জয়ী হয়েছেন ঘরের মাঠ শিবপুর থেকে। জিতেছেন বিজেপি নেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। সোনারপুর দক্ষিণে তিনি হারিয়েছেন গতবারের বিজয়ী অভিনেত্রী লাভলিকে। জিতেছেন হিরণও। উল্লেখযোগ্য জয় পাপিয়া অধিকারীর টালিগঞ্জ থেকে অরূপ বিশ্বাসকে হারিয়েছেন তিনি। অভিনেত্রী শর্বরী মুখোপাধ্যায় জিতেছেন। নির্বাচনে সেলেবপ্রার্থীর সংখ্যা কমালেও প্রচারে দেব, কোয়েল মল্লিকের মতো হেভিওয়েটদের নামিয়েছিল তৃণমূল। তাঁদের দেখতে ভিড় উপচে পড়লেও ভোটবাক্সে তা কাজে আসেনি। অবশ্য বিজেপি ক্ষমতায় আসতেই স্বাগত জানালেন, জিৎ, অঙ্কুশ, মিমি চক্রবর্তী, যশ দাশগুপ্ত, প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য, জিতু কামালের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।

রাজনীতি আর বিনোদন রাজ্য রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তারকাদের রাজনীতিতে যোগদানও। ভোটের প্রচারে ব্যবহার করা এই দুই দেখেছে পশ্চিমবঙ্গবাসী। তবে রাজনৈতিক পালাবদলের এই আবহে একের পর এক তারকা প্রার্থীদের ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন চিত্রনাট্য। কেউ রাজনীতিতে আসছেন আবার কেউ সরে দাঁড়াচ্ছেন হারের পর।