পুলিশে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে লালবাজারের সাইবার সেল ৷

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : বাংলা ভাষা, বাঙালি অস্মিতা আর হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই সরব বাংলা পক্ষ। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে প্রশাসনিক কাজ। সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার দাবিতে একাধিকবার আন্দোলনেও নেমেছে এই সংগঠন। আর সেই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা গর্গ চট্টোপাধ্যায় এবার খবরের শিরোনামে একেবারে অন্য কারণে। নির্বাচনের আবহে ইভিএম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। আর এই ঘটনাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।
নির্বাচনের আগে কমিশনের বিরুদ্ধে শোভাযাত্রায় অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ তোলে বাংলা পক্ষ। তাদের দাবি ছিল, পয়লা বৈশাখে শোভাযাত্রা বের করতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু তাদের অনুমতি দেয়নি কমিশন। অনুমতি না দিয়ে কমিশন বাঙালির গৌরব এবং সংস্কৃতির উপর আঘাত হেনেছে বলেও দাবি করা হয়। যদিও কমিশন জানায়, আদর্শ আচরণ বিধি কার্যকর থাকায় অনুমতি দেওয়া হয়নি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আবহে গর্গ প্রশ্ন তুলেছিলেন, রাতে দেখে শুনে সিল করে রাখার পরেও ভোটগণনার সময় কেন ইভিএম খারাপ হচ্ছে? ভবানীপুর বিধানসভার ভোটার গর্গ ভোট দিতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। অন্য দিকে, ভোট দিয়ে বার হওয়ার আগে ভাল করে ভিভিপ্যাট দেখে নিতেও পরামর্শ দিয়েছিলেন বাংলা পক্ষ-র প্রতিষ্ঠাতা।
রাজ্যে পালা বদল ঘটেছে। সেই পালাবদলের আবহের মাঝে বাংলা পক্ষের প্রতিষ্ঠাতা গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের উপর নেমে এল খাঁড়ার ঘা। বিধানসভা নির্বাচনের সময় ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে একাধিক বিভ্রান্তিকর তথ্য সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হয়েছিল ৷ সেইসব পোস্টের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবিশ্বাস ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলেই অভিযোগ তদন্তকারীদের ৷ বিষয়টি নজরে আসার পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কলকাতা পুলিশে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় ৷ সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে লালবাজারের সাইবার সেল ৷
লালবাজারের এক আধিকারিক জানান, গত কয়েক মাস ধরে গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, পোস্ট, লাইভ টেলিকাস্ট এবং ডিজিটাল কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা হচ্ছিল ৷ তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে বলে দাবি পুলিশের ৷ সেই সূত্র ধরেই মঙ্গলবার গ্রেফতার করা হয় গর্গকে ৷ পুলিশের দাবি, শুধুমাত্র মতপ্রকাশ নয়, পরিকল্পিতভাবে ভুয়ো তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেছিলেন গর্গ ৷ তদন্তকারীদের মতে, নির্বাচনের সময় তাঁর কয়েকটি পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সেগুলি ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয় ৷ বিশেষ করে ইভিএম হ্যাকিং, ভোট গণনায় কারচুপি এবং ফলাফল প্রভাবিত করার মতো অভিযোগ তুলে তিনি একাধিক পোস্ট করেছিলেন বলে অভিযোগ ৷
লালবাজার সূত্রে আরও জানা যায়, গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক-সহ একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে ৷ সেগুলি ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ৷ তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, এই পোস্টগুলি তিনি একাই করতেন, নাকি এর পিছনে আরও কোনও সংগঠিত চক্র কাজ করছিল ৷ পাশাপাশি, তাঁর সঙ্গে কারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং কোনও রাজনৈতিক বা অন্য সংগঠনের মদত ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে ৷ বিরোধী শিবিরের একাংশের দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে ৷ যদিও পুলিশের বক্তব্য, এটি রাজনৈতিক নয়, সম্পূর্ণ আইনানুগ পদক্ষেপ ৷ অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়েই গ্রেফতার করা হয়।
বুধবার ব্যাঙ্কশাল আদালতে পেশ করা হয় গর্গ চট্টোপাধ্যায়কে। তাঁকে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাঁকে নিজেদের হেফাজতে চেয়েছিল। গর্গের আইনজীবী অনির্বাণ গুহঠাকুরতা যুক্তি দেন, গর্গ একজন সম্মানীয় অধ্যাপক। তাঁর পোস্টগুলি নেহাতই ব্যক্তিগত। বিচারক বর্তমান পরিস্থিতি এবং মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন। আপাতত তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়।
বাংলা ভাষা, বাঙালি অস্মিতা আর সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্ন তুলে যিনি দীর্ঘদিন ধরে সরব ছিলেন, সেই গর্গ চট্টোপাধ্যায় এখন নিজেই আইনের জালে। একদিকে তাঁর সমর্থকদের দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর আঘাত হানা হচ্ছে। অন্যদিকে তদন্তকারীদের বক্তব্য, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের মনে অবিশ্বাস তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। ফলে বাংলা ভাষা ও বাঙালির অধিকারের লড়াই থেকে শুরু হওয়া বিতর্ক, শেষ পর্যন্ত পৌঁছল আদালতের কাঠগড়ায়। এখন দেখার, তদন্তে আর কী কী তথ্য সামনে আসে এবং এই মামলা আগামী দিনে বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে কতটা প্রভাব ফেলে।