‘আরশোলা’ বনাম ‘মৌমাছি’!

ব্যঙ্গ, ক্ষোভ না নতুন রাজনীতির খোঁজ— সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণদের দুই মুখ!

মাম্পি রায়, সাংবাদিক : দেশের ডিজিটাল পরিসরে গত কয়েক দিনে আচমকাই চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে দু’টি অদ্ভুত নাম— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং ‘বি পার্টি অব ইন্ডিয়া’ (বিপিআই)। কোনওটিই স্বীকৃত রাজনৈতিক দল নয়। তবু সামাজিক মাধ্যমে তাদের জনপ্রিয়তা, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের ভাষা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

এক দিকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, অন্য দিকে ‘বি পার্টি অব ইন্ডিয়া’। এক দল ক্ষোভের ভাষায় কথা বলছে, অন্য দল গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই স্পষ্ট— দেশের একাংশের তরুণ সমাজ প্রচলিত রাজনীতির বাইরে গিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য নতুন পথ খুঁজছে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ প্রথমে একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন হিসাবেই আত্মপ্রকাশ করে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতি ভাইরাল হয়ে যায়। পরে তাদের এক্স অ্যাকাউন্ট ভারতে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে খবর। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দাবি করেন, ওয়েবসাইট এবং একাধিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মও বাধার মুখে পড়েছে।

সমর্থকদের বক্তব্য, সিজেপি আসলে বেকারত্ব, বৈষম্য এবং সাধারণ মানুষকে ‘তুচ্ছ’ করে দেখার প্রবণতার বিরুদ্ধে এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ। ‘ককরোচ’-এর প্রতীক ব্যবহার করে তারা বোঝাতে চেয়েছে— অবহেলিত, বিদ্রুপের শিকার কিংবা বেকার তরুণরাও টিকে আছে, লড়ছে এবং নিজেদের কথা বলার অধিকার দাবি করছে।

সিজেপির তথাকথিত ‘ঘোষণাপত্রে’ উঠে এসেছে কর্মসংস্থান, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তরুণদের প্রশ্ন তোলার অধিকারের মতো ইস্যু। যদিও সমালোচকদের একাংশের দাবি, এই আন্দোলনের অনলাইন জনপ্রিয়তা যতটা চোখে পড়ছে, বাস্তবে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব ততটা নয়।

অন্য দিকে, ‘বি পার্টি অব ইন্ডিয়া’ একেবারেই ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সেখানে প্রতিবাদের বদলে জোর দেওয়া হচ্ছে সম্মিলিত উদ্যোগ এবং ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের উপর। মৌমাছির প্রতীক ব্যবহার করে তারা বোঝাতে চাইছে— প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করলে সমাজ মিলিত ভাবে আরও বড় কিছু গড়ে তুলতে পারে।

বিপিআইয়ের বক্তব্য, রাজনীতি কেবল সংঘাত বা বিভাজনের বিষয় নয়; সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাবনায় রয়েছে যুব কর্মসংস্থান, শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, স্থানীয় উদ্যোগ, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা।

দুই সংগঠনের মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট। সিজেপি বলছে, “আমাদের আর উপেক্ষা করা যাবে না।” বিপিআই বলছে, “এসো, একসঙ্গে নতুন কিছু গড়ি।” এক পক্ষের ভাষা ক্ষোভের, অন্য পক্ষের ভাষা পুনর্গঠনের।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই দুই অনলাইন আন্দোলনের উত্থান একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে আনছে— তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক ভাবে নীরব নয়। তারা সব সময়ে মিছিল, সভা বা প্রচলিত দলের কার্যালয়ের মাধ্যমে নিজেদের প্রকাশ করছে না। কখনও মিম, কখনও ব্যঙ্গ, কখনও হ্যাশট্যাগ— ডিজিটাল সংস্কৃতিই হয়ে উঠছে নতুন রাজনৈতিক ভাষা।

প্রশ্ন উঠছে, এই ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্মগুলি কি শুধুই ‘ইন্টারনেট ট্রেন্ড’? নাকি ভবিষ্যতে তা নাগরিক অংশগ্রহণের নতুন রূপ নিতে পারে? উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এতটুকু নিশ্চিত, তরুণ সমাজের একাংশ প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন ভাষায় নিজেদের হতাশা, প্রত্যাশা এবং স্বপ্ন প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

‘টিকে থাকা আরশোলা’ আর ‘গড়ে তোলা মৌমাছি’-র মাঝখানে দাঁড়িয়ে এখন প্রশ্ন একটাই— ভারতের তরুণরা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে কোন পথে দেখতে চায়?