শওকত মোল্লার বাড়ি, দলীয় কার্যালয়ে NIA তল্লাশি। একই সময়ে এনআইএ-র আরেকটি দল মৌখালিতে, আরেকটি দল ইমরান মোল্লার ক্যাফেতেও তল্লাশি চালায়।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : মাছ চুরি। তারপর নাকি নদী চুরি। সেই টাকায় ক্যাফে। এবার একেবারে বাড়ি থেকে নিজেই হাওয়া। কোনও পাত্তাই নেই। সেই দাপট। সেই একছত্র রাজত্ব আজ আর নেই। তাঁকে খুঁজতে ছোটাছুটি করছেন তদন্তকারী দলের আধিকারিকরা। কিন্তু টিকিটিও পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গেলেন শওকত মোল্লা?
কথাতেই আছে, চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়। তা যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে শওকতের সঙ্গে। ২০২১ সালে ক্যানিং পূর্ব থেকে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন শওকত। এবার অবশ্য তাঁকে ভাঙড়ে লড়তে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন আইএসএফ-এর নওশাদ সিদ্দিকি। আর নওশাদের বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে হারতে হয় তাঁকে। এরপর থেকেই মোটামুটি রাজনীতি থেকে কার্যত নিরুদ্দেশ শওকত। তাঁকে দেখাই যাচ্ছিল না। আর তারপরই শওকতকে নিয়ে নানা অঙ্ক করতে শুরু করে দেয় রাজনৈতিক মহল।
বুধবারই বড়দিন হয়ে গিয়েছে তৃণমূলের অন্দরে। ভেঙে ছত্রখান হয়ে গিয়েছে গোটা দলটাই। বিগত কয়েকদিনের একটানা টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত বুধবার স্পিকারের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার চেয়ারে বসেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বসেই ক্ষোভ উগরে দেন এককালের তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। এই ঋতব্রতর সঙ্গেই বুধবার রাতে দেখা করেন শওকত মোল্লা। ঋতব্রতর সঙ্গে বিধানসভায় মিনিট দশেক কথা হয় শওকতের। কথা হয় রাজ্য রাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে। কথা বলেন বিরোধী দলনেতার ঘরেই। আচমকা শওকত-ঋতব্রত সাক্ষাৎ নিয়েও রাজনৈতিক মহলে চলছে চর্চা।
ঠিক তাঁর পরের দিনই শওকতের দরজায় কড়া নাড়ে এনআইএ। ভাঙড়ের বামুনিয়া বিস্ফোরণকাণ্ডের তদন্তে বৃহস্পতিবার সকালে বড় পদক্ষেপ করল জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা তথা এনআইএ। তদন্তের সূত্র ধরে ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক শওকত মোল্লার জীবনতলার বাড়িতে হানা দেন এনআইএ আধিকারিকরা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে নিয়ে সকালেই গোটা এলাকা ঘিরে ফেলা হয়। তবে তদন্তকারী দল পৌঁছনোর আগেই শওকত মোল্লা বাড়ি ছেড়ে চলে যান । শওকতের ছেলে ইমরান মোল্লাকে সঙ্গে নিয়ে এনআইএ আধিকারিকরা বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং তল্লাশি শুরু করেন। শুধু বাড়িই নয়, শওকত মোল্লার দলীয় কার্যালয়েও তল্লাশি চালানো হয়। একই সময়ে এনআইএ-র আরেকটি দল মৌখালিতে ইমরান মোল্লার ক্যাফেতেও তল্লাশি চালায়।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, নির্বাচনের আগে এলাকায় বিপুল পরিমাণ বোমা মজুত করে রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল এলাকায় ভয় ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করা। সেই সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরকের মজুতকরণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য সংগ্রহ করতেই এই তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। শওকতকে না পেয়ে গ্রেফতার করা হয় তাঁর ছেলে ইমরানকে। শওকতের এই পরিণতিতে ভাঙড়ের তৃণমূল নেতা কাইজার আহমেদ বলেন, এটা হওয়ারই ছিল। এই কাইজারের সঙ্গে শওকতের কিন্তু সাপে নেউলে সম্পর্ক।
একসময় ভাঙড়-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে শওকত মোল্লার নামই ছিল শেষ কথা। তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেতেন অনেকেই। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরেছে। ভোটে পরাজয়, দলের অন্দরে বদলে যাওয়া সমীকরণ এবং এবার এনআইএ-র তল্লাশি-সব মিলিয়ে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন একদা দাপুটে এই নেতা। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, যে ক্ষমতার বলয়ে দীর্ঘদিন তিনি ছিলেন, আজ সেই বলয়ই যেন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
তবে শওকত মোল্লার খোঁজ এখনও মেলেনি। তাঁকে না পেয়ে ছেলে ইমরান মোল্লাকে গ্রেফতার করেছে এনআইএ। বিস্ফোরক মজুত ও সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসতে পারে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা। অন্যদিকে, শওকতের এই পরিস্থিতি নিয়ে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক চর্চা। একসময় যাঁর নামেই কেঁপে উঠত গোটা এলাকা, আজ তাঁকেই খুঁজে বেড়াচ্ছেন তদন্তকারীরা। আর সেই ছবিই যেন বাংলার বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন বার্তা তুলে ধরছে।