জাহাঙ্গিরের ফলতায় অ্যাকশনে পুলিশ !

অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে নতুন মামলা দায়ের। পুলিশকে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও গ্রেফতার।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : ফলতা থানা থেকে তাকে ছাড়ানোর জন্য লোকজন জড়ো করে বিক্ষোভ। বিপাকে স্ত্রী। অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে নতুন মামলা দায়ের। পুলিশকে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও গ্রেফতার। ধীরে ধীরে বাড়ছে গ্রেফতারির সংখ্যা।

একসময় ফলতার রাজনীতিতে ছিল তাঁর দাপট। ভোট মানেই অভিযোগ, ভয়ভীতি আর প্রভাব খাটানোর বিতর্কে বারবার উঠে এসেছে তাঁর নাম। এমনকি পুনর্নির্বাচনের আগেই ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। তাঁকে ঘিরেই তোলপাড় ফলতা। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে ২ দফায়। দ্বিতীয় দফায় ভোট ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ফলতায়। তবে ভোটের দিন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আসায় নির্বাচন বাতিল করে কমিশন। ফের ভোট হয় ফলতায়। তবে এই পুনির্নির্বাচনের ঠিক আগেই ভোট থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ভূরি ভূরি। এবছর ভোটের ময়দানে তিনি না থাকায় নাকি ফলতাবাসী মন খুলে নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন বলে জানান। ফলতায় যাঁর দাপট ছিল লাগামছাড়া । তাঁকেই কখনও দেখা গেছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে, কখনও রাস্তায় কান ধরতে। এবার তাঁকে ছাড়ানোর জন্য থানায় হামলা চালাতে গিয়ে, পালানোর পথ পেল না তার বাহিনী।

ঘটনার সূত্রপাত, জাহাঙ্গিরকে থানা থেকে মুক্ত করার পূর্বপরিকল্পিত পরিকল্পনা থেকে। জাহাঙ্গিরের স্ত্রীর নেতৃত্বে একটি বৈঠক হয়। সেই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ফলতা থানা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে সমর্থকদের জড়ো করা হবে। এর পর সেখান থেকে সংগঠিত ভাবে থানায় হামলা চালিয়ে জাহাঙ্গির খানকে ছাড়িয়ে আনার ছক কষা হয়েছিল। পুরো ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কারা ছিল এবং পরিকল্পনায় আর কারা জড়িত, তা ধৃতদের জেরা করে জানার চেষ্টা করছে পুলিশ। তদন্ত এগোলে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হয় ।

এমন পরিস্থিতিতে বুধবার জনকল্যাণ শিবিরের একটি অনুষ্ঠানে ফলতার ফতেপুরে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে তিনি নিজেই মঙ্গলবারের ঘটনার প্রসঙ্গ তোলেন। বলেন, টিভিতে দেখলাম, এক মাফিয়ার স্ত্রীর নেতৃত্বে কিছু লোক পুলিশ এবং প্যারামিলিটারিকে আক্রমণ করতে গিয়েছিল। ভিডিয়োতে যাদের দেখা গিয়েছে, তারা কেউ যেন বাড়িতে না থাকে। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

সঙ্গে হুঁশিয়ারিও দেন মুখ্যমন্ত্রী। কেউ যেন নিজের হাতে আইন না তুলে নেন। কোনও গুন্ডামি, জঙ্গিপনা বরদাস্ত করা হবে না। তার পরই পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন, থানায় হামলা চালানোর ঘটনায় ভিডিয়োতে যাঁদের গিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের ধারায় মামলা রুজু করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সেই হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাহাঙ্গিরের স্ত্রীর বিরুদ্ধে অস্ত্র এবং বিস্ফোরক আইনে নতুন করে মামলা রুজু করা হয় ফলতা থানায়। তারপরই ধরপাকড়।

শুভেন্দুর হুঁশিয়ারির পর অ্যাকশনে পুলিশ, ফলতায় জোর ধরপাকড়। মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশের পর ফলতা থানায় হামলার ঘটনায় জোরদার হয় পুলিশি অভিযান। বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও ও ছবি খতিয়ে দেখে আরও ৮ জনকে গ্রেফতার করে ফলতা থানার পুলিশ। এই নিয়ে মোট গ্রেফতারির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬। ধৃতদের বিরুদ্ধে অবৈধ জমায়েত, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, সরকারি কাজে বাধা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলা রুজু।

একসময় ফলতার রাজনীতিতে যাঁর নাম উচ্চারণ মানেই ছিল আতঙ্কের পরিবেশ, সেই জাহাঙ্গির খানকে ঘিরেই এবার আইন-শৃঙ্খলার বড় পরীক্ষা। থানায় হামলা, অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, পুলিশকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে গোটা ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই একাধিক ধারায় মামলা রুজু। তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতদের জেরা করে হামলার নেপথ্যে থাকা মূল চক্রীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। ফলে আগামী দিনে গ্রেফতারির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তার পর স্পষ্ট, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ফলতায় শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতির বদলে এখন প্রশাসনের নজর আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়। একসময় যাঁর নামেই এলাকা কাঁপত, তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ফের প্রমাণ করল। ক্ষমতার দাপট যত বড়ই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।