সুন্দরবনে কর্মশালা ‘শের’

বাঘ সংরক্ষণের লক্ষ্যে হাতিয়ার রান্নাবাড়ি! সুন্দরবনে পর্যটক আকর্ষণে কর্মশালা ‘শের’-এর।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা: একদিকে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণ রক্ষা অন্যদিকে জঙ্গলের প্রতি মানুষের নির্ভরশীলতা কমানো, জঙ্গল লাগোয়া প্রান্তিক মানুষগুলিকে নিজেদের পায়ে দাঁড় করিয়ে স্বনির্ভর করে তোলা, এই উদ্দশ্যেই দু-দিনের রান্নার কর্মশালা অনুষ্ঠিত হল সুন্দরবনের পাখিরালায়ে। ‘ইউরো-শের’ কনজারভেশন প্রোগ্রামের আওতায় পাখিরালয়ের বাঘবনে সম্প্রতি এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শেফ পিনাকী রায়ের তত্ত্বাবধানে হাতে কলমে নানান ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রান্নার পদ শিখলেন সুন্দরবনের কুড়ি জন পুরুষ ও মহিলা।

সুন্দরবনের জঙ্গল লাগোয়া গ্রামের মানুষের বিকল্প জীবিকার জন্য স্কিল বিল্ডিং, জঙ্গল নির্ভরতা কমানো এবং বাঘ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে পাশে নিয়ে চলার লক্ষ্যেই এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বন্যপ্রাণপ্রেমী সংস্থা ‘সোসাইটি ফর হেরিটেজ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিসার্চেস’ (শের)।

এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ সংলগ্ন বনপ্রান্তিক এলাকার বাসিন্দাদের উন্নত রন্ধনশৈলী সংক্রান্ত দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা, যাতে তারা সুন্দরবনের ক্রমবর্ধমান পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন এই প্রান্তিক মানুষজন।

গত এক দশকে সুন্দরবন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণ পর্যটন স্থান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত পর্যটকদের ক্রমাগত সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নানান ধরনের খাবার ও রান্নার চাহিদাও বেড়েছে। পর্যটনশিল্পের এই চাহিদাকে মাথায় রেখে বিশেষত জঙ্গল লাগোয়া এলাকার মানুষ, যারা পর্যটন ক্ষেত্রে রান্নার পেশার সঙ্গে যুক্ত তাদের জন্য এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

দুই দিনের এই কর্মশালায় ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের রান্না, আধুনিক রন্ধন কৌশল, নতুন রেসিপির পরিচয়, মেনু পরিকল্পনা প্রভৃতি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা আধুনিক পেশাদার রন্ধনশৈলীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের রান্নার জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পান এই কর্মশালায়।

শেরের সম্পাদক জয়দীপ কুন্ডু বলেন, “বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে মানুষের জঙ্গলের উপর নির্ভরতা কমবে। ফলে বাঘের জঙ্গলের উপর চাপ কমবে, বাঘ ও মানুষের সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান সুদৃঢ় হবে। পাশাপাশি সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাবে সুন্দরবনের পর্যটনও।”

উদ্যোক্তাদের দাবি, বিকল্প জীবিকা, স্থায়ী পর্যটন এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ—এই তিনটি সূত্রকে একসাথে জুড়লে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাস্তুতন্ত্র কেন্দ্রিক ফলাফল দীর্ঘমেয়াদী করা সম্ভব। জীবিকা উন্নয়নকে সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে এই উদ্যোগ সুন্দরবনের মানুষকে বাঘ ও বন সংরক্ষণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

এই কর্মশালায় অংশ নেওয়া সুবর্ণলতা, শিবানীরা বলেন, “ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে যেমন পর্যটকরা আসেন সুন্দরবনে, তেমনি বিদেশ থেকেও আসেন। ফলে এক একজনের স্বাদ এক এক রকমের। বিভিন্ন ধরনের রান্না না জানায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল। এই কর্মশালায় আমরা বহু দেশি ও বিদেশি পদের রান্না হাতে কলমে শিখলাম। ফলে অতিথিদের চাহিদা মত ও গুনমান সম্পন্ন খাবার পরিবেশন করতে এবার অসুবিধা হবে না।”