কড়া পুলিশি ঘেরাটোপে শওকত, রাস্তায় জনস্রোত— বাজল ‘শওকত মাছ চোর’ গান।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে ফের শোরগোল। ক্যানিং পূর্বের প্রাক্তন বিধায়ক শওকত মোল্লাকে বৃহস্পতিবার কড়া পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে এলাকায় ঘোরানো হল। তাঁকে দেখতে রাস্তার দু’ধারে ভিড় জমালেন অসংখ্য মানুষ। রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। তবে তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খান-কে যেভাবে কোমরে দড়ি বেঁধে ও হাফপ্যান্ট পরিয়ে এলাকায় ঘোরানো হয়েছিল, শওকত মোল্লার ক্ষেত্রে তেমন দৃশ্য দেখা যায়নি। বরং তাঁকে ঘিরে ছিল কড়া নিরাপত্তা বলয়, সঙ্গে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী।
কয়েকদিন আগেই এনআইএ শওকত মোল্লাকে কলকাতা-র চিংড়িঘাটা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। ভাঙড়ে বোমা বিস্ফোরণ মামলায় তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এই পদক্ষেপ করে। গ্রেফতারের পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এনআইএ হেফাজতে। পরে আদালতের নির্দেশে এনআইএ হেফাজত থেকে চার দিনের জন্য জীবনতলা থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাঁকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জীবনতলা থানায় শওকত মোল্লার বিরুদ্ধে ধর্ষণের একটি গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সেই মামলার তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতেই তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয় জেলা পুলিশ। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে শওকত মোল্লাকে জীবনতলা থানায় নিয়ে আসা হয়। তারপর থেকেই এলাকাজুড়ে শুরু হয় জোর জল্পনা— কবে তাঁকে নিয়ে তদন্তে নামবে পুলিশ এবং কী পদক্ষেপ করা হবে।
অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে জীবনতলা থানা থেকে শওকত মোল্লাকে বের করা হয়। পুলিশের একটি বড় কনভয়ের মধ্যে তাঁকে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি, মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক স্থান চিহ্নিত করা, স্থানীয় সূত্র যাচাই এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখার জন্যই এই পরিদর্শন জরুরি ছিল। পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় শওকত মোল্লাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ভয় ও প্রভাবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেটি ভাঙার বার্তাও দিতে চেয়েছে পুলিশ।
শওকত মোল্লাকে দেখতে এদিন রাস্তায় উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। পুরুষ, মহিলা, যুবক— নানা বয়সের মানুষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তাঁকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। অনেকে মোবাইলে ভিডিও রেকর্ড করেন, আবার কেউ কেউ সরাসরি নানা মন্তব্য ছুড়ে দেন। পুলিশকে বারবার ভিড় নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খেতে দেখা যায়। পরিস্থিতি যাতে উত্তপ্ত না হয়, সে কারণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।
এদিকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ শওকত মোল্লাকে কটাক্ষ করে এলাকায় গান বাজাতে শুরু করেন। বিশেষ করে ‘শওকত মাছ চোর’ শিরোনামের একটি ব্যঙ্গাত্মক গান বাজানো হয়, যা ঘিরে জনতার মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিরোধীদের দাবি, শওকত মোল্লার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার মানুষ জানতেন, কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এতদিন কেউ মুখ খুলতে পারেননি।
অন্যদিকে শওকত মোল্লার অনুগামীদের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একের পর এক অভিযোগ আনা হচ্ছে। তাঁরা অভিযোগ করেন, বিরোধীরা পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। যদিও তদন্তকারী সংস্থাগুলি স্পষ্ট জানিয়েছে, সমস্ত পদক্ষেপই তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে শওকত মোল্লাকে এলাকায় ঘোরানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলা থেকে ধর্ষণের অভিযোগ— একের পর এক মামলায় জড়িয়ে পড়ায় প্রাক্তন বিধায়কের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও জল্পনা বাড়ছে। তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং আগামী দিনে আরও কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।