পিতৃপক্ষের অবসান হয়ে দেবীপক্ষের সূচনা। মহালয়ার পুণ্যলগ্নে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তর্পণ করলেন অসংখ্য মানুষ। ভোরের আলো ফুটতেই রাজ্যের বিভিন্ন নদী ও গঙ্গার ঘাটে ভিড় জমাতে শুরু করেন পুণ্যার্থীরা।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
কোথাও পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, কোথাও তিল-জল দিয়ে পিতৃপুরুষের উদ্দেশে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন- সব মিলিয়ে মহালয়ার সকালে ঘাটে ঘাটে তৈরি হয় এক ভক্তিময় পরিবেশ। হাওড়া থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা- দুই জেলাতেই সকাল থেকেই চোখে পড়েছে পুণ্যার্থীদের ভিড়। তবে ভিড় সামলাতে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে প্রশাসনের তরফেও নেওয়া হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
মহালয়ার ভোর থেকেই হাওড়ার বিভিন্ন গঙ্গার ঘাটে শুরু হয় তর্পণ। রামকৃষ্ণপুর ঘাট, শিবপুর ঘাট, সাঁকরাইলের বিভিন্ন ঘাট থেকে শুরু করে বেলুড় ঘাট- সর্বত্রই পুণ্যার্থীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। শাস্ত্রীয় রীতি মেনে গঙ্গার জলে দাঁড়িয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেন বহু মানুষ। তিল ও জল নিবেদন করে প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করেন তাঁরা। পিতৃপক্ষের অবসান এবং দেবীপক্ষের সূচনার এই বিশেষ দিনে অনেকের কাছেই তর্পণ শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, বরং পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এক আবেগঘন মুহূর্ত। ভোরের ঘাটগুলিতে তাই দেখা যায় নানা বয়সের মানুষের উপস্থিতি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘাটে এসে তর্পণে অংশ নেন অনেকে। অন্যদিকে, পুণ্যার্থীদের ভিড় সামলাতে হাওড়ার ঘাটগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোতায়েন ছিলেন হাওড়া সিটি পুলিশ, হাওড়া গ্রামীণ পুলিশের কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা। পাশাপাশি গঙ্গায় নজরদারি চালায় রিভার ট্রাফিক পুলিশ। জলপথে কোনও বিপদ বা দুর্ঘটনার আশঙ্কা এড়াতে বিশেষ নজর রাখা হয়। সব মিলিয়ে, প্রশাসনের তৎপরতায় হাওড়ার বিভিন্ন ঘাটে তর্পণ পর্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়।
একই ছবি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাতেও। মহালয়ার ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন নদীর ঘাট এবং গঙ্গার শাখানদীর তীরে ভিড় জমাতে শুরু করেন পুণ্যার্থীরা। বারুইপুরের ঐতিহ্যবাহী সদাব্রত ঘাটে তর্পণ করতে সকাল থেকেই হাজির হন বহু মানুষ। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ঘাটে উপচে পড়ে ভিড়। পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে তিল, জল ও যব দিয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেন পুণ্যার্থীরা। পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের আত্মার শান্তি কামনায় অঞ্জলি দেন নানা বয়সের মানুষ। শুধু বারুইপুর নয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যান্য নদী ও জলাশয় সংলগ্ন এলাকাতেও দেখা যায় একই ছবি। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মহালয়ার সকাল হয়ে ওঠে ভক্তিময়।
তর্পণ উপলক্ষে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা এড়াতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন ঘাটেও বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে পুলিশ ও প্রশাসন। ঘাটগুলিতে ভিড় সামলাতে বসানো হয় পুলিশি গার্ডরেল। গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলিতে নজরদারির জন্য ব্যবহার করা হয় সিসিটিভি ক্যামেরা ও অস্থায়ী ওয়াচ টাওয়ার। পাশাপাশি প্রস্তুত রাখা হয় বিপর্যয় মোকাবিলা দল এবং স্পিডবোট। ঘাটে ঘাটে মোতায়েন ছিলেন সিভিক ভলান্টিয়ার ও কুইক রেসপন্স টিমের সদস্যরা। ভিড়ের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের বিশেষভাবে সতর্ক রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি গভীর জলে না নামার নির্দেশও দেওয়া হয় প্রশাসনের তরফে।
মহালয়া মানেই একদিকে পূর্বপুরুষদের স্মরণ, অন্যদিকে দেবীপক্ষের আগমনের বার্তা। সেই আবেগ ও ধর্মীয় রীতিকে সঙ্গী করেই হাওড়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন ঘাটে তর্পণে অংশ নিলেন অসংখ্য মানুষ। একদিকে ঘাটে ঘাটে শ্রদ্ধা নিবেদন, অন্যদিকে নিরাপত্তা বজায় রাখতে প্রশাসনের তৎপরতা- সব মিলিয়ে দুই জেলাতেই মহালয়ার সকাল কাটল ভক্তিময় পরিবেশে। পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনায় এবারও তর্পণের মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ করলেন মানুষ। আর সেই সঙ্গে শুরু হল বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোর প্রতীক্ষা।