একদিকে বই। অন্যদিকে রাজনৈতিক মতাদর্শ। একদিকে নিজের পছন্দের কথা বলার অধিকার, অন্যদিকে সেই মতের বিরোধিতা করার স্বাধীনতা। কিন্তু মতের লড়াই যখন সংঘাতের চেহারা নেয়, যখন বুকস্টলকে কেন্দ্র করে আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের অভিযোগ ওঠে, তখন প্রশ্ন ওঠে গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গাটা কি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে? উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়ায় বামেদের বুকস্টলকে কেন্দ্র করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বাম কর্মীদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা। প্রতিবাদে অষ্টমীর সন্ধ্যায় রাস্তায় বসে স্লোগান দিতে থাকেন বামকর্মী, সমর্থকেরা। দুই পক্ষের বক্তব্য, অভিযোগ এবং পাল্টা বক্তব্যের মধ্যেই সামনে আসছে আরও বড় প্রশ্ন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
কেউ কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী হতেই পারেন। কোনও বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন। কিন্তু সেই বিরোধিতার জবাব কি হামলা, ভাঙচুর কিংবা বলপ্রয়োগ হতে পারে? বুকস্টলে হামলা বা ভাঙচুরের অভিযোগ সত্য হলে, তা কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, মতের বিরোধিতা করার অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনই নিজের মত প্রকাশ করার অধিকারও গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। বাদুড়িয়ার এই ঘটনাকে শুধু দুই পক্ষের সংঘাত হিসেবে দেখলেই কি পুরো ছবিটা বোঝা যাবে? নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন?
বামেদের বুকস্টল ঘিরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বাম কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনার ঘটনা সামনে আসতেই প্রশ্ন উঠছে, ঠিক কী নিয়ে আপত্তি? বুকস্টলে রাখা বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে মতবিরোধ? রাজনৈতিক প্রচার নিয়ে আপত্তি? নাকি অন্য কোনও কারণ? সংঘাতের কারণ যা-ই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে বিরোধ তৈরি হলে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা এবং আইনি পথে। হাতাহাতি বা হামলার মাধ্যমে নয়।
ঘটনাকে ঘিরে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বক্তব্য কী? বুকস্টলে কী নিয়ে আপত্তি ছিল? বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বাদুড়িয়া প্রখণ্ড-র পক্ষ থেকে, বামদের বুকস্টল ঘুরে দেখে সেখানে কোনও দেশবিরোধী বই আছে কিনা তার খোঁজখবর নিতে গেলে মহিলা বাম কর্মীদের দ্বারা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ কর্মীদের উপর আচমকা আক্রমণ করা হয় বলে অভিযোগ।

এবার প্রশ্ন, বামেদের তরফে কী বলা হচ্ছে? একটি রাজনৈতিক সংগঠন বা মতাদর্শের বক্তব্যের সঙ্গে অন্য কোনও সংগঠনের মত না মিলতেই পারে। গণতন্ত্রে সেই মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়। বরং বিভিন্ন মতের সহাবস্থানই গণতান্ত্রিক সমাজকে শক্তিশালী করে। কিন্তু সেই মতবিরোধ সামলানোর পদ্ধতিটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও বইয়ের বক্তব্য আপত্তিকর মনে হলে তার প্রতিবাদ করা যায়। বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। প্রকাশ্যে বিতর্কের আয়োজন করা যায়। প্রয়োজনে আইন মেনে প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়া যায়।কিন্তু বই বিক্রি বা রাজনৈতিক মত প্রকাশের বিরোধিতা করতে গিয়ে যদি কারও উপর হামলা হয়, সম্পত্তি নষ্ট করা হয় কিংবা ভয় দেখিয়ে কাউকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের সীমা ছাড়িয়ে যায়।
বুকস্টল ঘিরে সংঘাতের ঘটনায় বামেদের বক্তব্য কী? তাঁদের অভিযোগ, কীভাবে উত্তেজনার সূত্রপাত? এই ঘটনার পর প্রশাসনের কাছে তাঁদের দাবি কী? পুলিশের সামনে সব ঘটনা ঘটলেও পুলিশ চুপ ছিল বলে দাবি বাম নেত্রী অলিভিয়া মুখার্জির। দুই পক্ষের বক্তব্য শোনার পরেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় রাজনৈতিক বিরোধ মেটানোর ভাষা কি তবে সংঘাত হয়ে উঠবে? বইয়ের স্টল শুধুমাত্র বই কেনাবেচার জায়গা নয়। সেখানে মানুষ বিভিন্ন মতাদর্শের সঙ্গে পরিচিত হন, নতুন ধারণা সম্পর্কে জানতে পারেন, প্রশ্ন তোলেন, তর্ক করেন। কোনও বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত হলে সেই দ্বিমত প্রকাশেরও অধিকার রয়েছে।
কিন্তু বইয়ের উত্তর বই দিয়ে, যুক্তির উত্তর যুক্তি দিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে যদি সংঘাতের আশ্রয় নেওয়া হয়, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি সংগঠনের হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের মুক্তচিন্তার পরিবেশও। আর এখানেই বাদুড়িয়ার ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগ।আজ কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের বইয়ের স্টল বন্ধ করার চেষ্টা হলে, কাল অন্য কোনও মতের প্রকাশও বাধার মুখে পড়তে পারে। আজ যে পক্ষের বক্তব্য আমাদের অপছন্দ, কাল সেই পক্ষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করার প্রয়োজনও তৈরি হতে পারে। তাই প্রশ্নটি শুধু বামেদের বুকস্টল নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হল, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকের মত প্রকাশের অধিকার কতটা সুরক্ষিত?
বাদুড়িয়ার বুকস্টল ঘিরে সংঘাতের ঘটনায় রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্ন রয়েছে, দুই পক্ষের বক্তব্য রয়েছে, রয়েছে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে একটি মৌলিক নীতি মতাদর্শের বিরোধিতা করা যায়, কিন্তু বিরোধিতার নামে হামলাকে স্বাভাবিক করে তোলা যায় না। কেউ বামপন্থী হবেন, কেউ দক্ষিণপন্থী। কেউ কোনও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, কেউ থাকবেন না। কারও রাজনৈতিক বক্তব্য কারও পছন্দ হবে, কারও হবে না। এই বৈচিত্র্যই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চেহারা।কিন্তু মতের অমিল মানেই শত্রুতা নয়। বিরোধিতা মানেই প্রতিপক্ষকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়।
কোনও বুকস্টলে আপত্তি থাকলে যুক্তি দিয়ে সেই আপত্তি জানানো হোক। কোনও বইয়ের বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক থাকলে পাল্টা বক্তব্য সামনে আসুক। আর কোনও অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, আইন আইনের পথে চলুক। কারণ, গণতন্ত্রে কোনও মতকে হারানোর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হামলা নয়, যুক্তি। আর কোনও বইয়ের জবাব দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বই, চিন্তা এবং বিতর্ক। বাদুড়িয়ার এই ঘটনা তাই শুধু একটি বুকস্টল ঘিরে সংঘাতের খবর নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা কতটা জরুরি।