অসুস্থ, মানুষদের দিন-রাত সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলতে এঁরা নিরলস কাজ করেন।রোগীর শারীরিক অবস্থার নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, ওষুধ ও ইনজেকশন সময়মতো দেওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশ নিখুঁতভাবে পালন করা যাদের প্রধান কাজ। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি বা মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেন নার্সরা।সমাজে নার্সদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।হাসপাতাল -নার্সিংহোম-স্বাস্থ্যকেন্দ্র যাদেরকে ছাড়া ভাবাই যায় না। তবে এই নার্সদের অভাবেই ভুগছে গোটা দেশ। কেন?নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা? নাকি নার্সিং পেশায় আগ্রহ কমছে বর্তমান প্রজন্মের?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ
ভারতে পর্যাপ্ত নার্সের অভাব দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান ও গভীর সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১,০০০ জন মানুষের জন্য ৩ জন নার্স থাকা প্রয়োজন।সেখানে ভারতে এই অনুপাত মাত্র ১.৯৬ জন। ফলস্বরূপ, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।এই অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এই তীব্র ঘাটতির কারণে একদিকে যেমন স্বাস্থ্যসেবার মান বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্তমান নার্সদের ওপর মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রচণ্ডভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ভারতে নার্সিং প্রশিক্ষিত পদের সংখ্যা বা ডিগ্রিধারীর অভাবের চেয়েও বড় সমস্যা হলো প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার ঘাটতি। কাগজে-কলমে প্রচুর গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও হাতে-কলমে দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যের অভাবে অনেক নার্স সরাসরি কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারছেন না।অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব বা পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল এক্সপোজারের ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করলেও সরাসরি বাস্তব রোগীর সেবা বা জটিল পরিবেশে কাজ করার আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা খাতের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এমন পুরনো সিলেবাস অনেক প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়। এর ফলে ডিজিটাল ডকুমেন্টেশন, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল প্রোটোকল সম্পর্কে নার্সদের সম্যক ধারণা থাকে না। ভালো মানের বহু নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোতে অভিজ্ঞ ও যোগ্য শিক্ষকের সংকট রয়েছে।
এবার এই কাজের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে কত পারিশ্রমিক দেওয়ায় হয়ে থাকে ?সরকারি হাসপাতালে নার্সদের বেতন পে কমিশন ও নির্ধারিত গ্রেড অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। সরকারি নার্সিং পদে বেসিক পে, ডিএ, এইচআরএ ও অন্যান্য ভাতাসহ প্রারম্ভিক মাসিক মোট বেতন সাধারণত ৩৫,০০০ থেকে ৪৫,০০০ টাকার মধ্যে হয়।অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে পে-স্কেল ও পদোন্নতির মাধ্যমে বেতন বেড়ে মাসিক ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ বা তার বেশি হতে পারে। সঙ্গে নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ,চিকিৎসা ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়
বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিং হোমগুলোতে নির্দিষ্ট কোনো সরকারি বেতন কাঠামো থাকে না। শহর, হাসপাতালের মান এবং কাজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বেতন নির্ধারিত হয়। ছোট শহর বা সাধারণ মানের বেসরকারি হাসপাতালে নতুনরা সাধারণত ১২,০০০ থেকে ১৮,০০০ এবং বড় মেট্রো শহরের নামি হাসপাতালে ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ মাসিক বেতন পেয়ে থাকেন।৫ থেকে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং আইসিইউ বা বিশেষ কোনো বিভাগে দক্ষতা থাকলে মাসিক বেতন ৩৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। উচ্চপদস্থ নার্স ম্যানেজার বা সুপারিনটেনডেন্টরা আরও বেশি আয় করেন। বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বা অ্যাপ্ৰেইজাল হাসপাতালভেদে ভিন্ন হয় ।কোথাও ৮-১৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি ঘটে, আবার কোথাও কাঠামোগত বৃদ্ধি থাকে না।
ভারতে নার্স সংকটের প্রধান কারণগুলোর অন্যম হল এই বেতন পরিকাঠামো । রয়েছে আরও বেশকিছু কারন। সেগুলি হল-
যে বিষয়টি প্রথমেই বললাম।ভারতের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে নার্সদের অত্যন্ত কম বেতন দেওয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় এই পারিশ্রমিক খুবই সামান্য, যা অনেককে এই পেশায় আসতে বা টিকে থাকতে নিরুৎসাহিত করে।এছারাও রয়েছে বিদেশি চাকরির হাতছানি।ভারতীয় নার্সদের দক্ষতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। যুক্তরাজ্য , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অনেক বেশি বেতন, উন্নত জীবনযাত্রা এবং সামাজিক মর্যাদার সুযোগ থাকায় প্রতি বছর হাজার হাজার অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত নার্স বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভারতে নার্সিং পেশাকে এখনো কাঙ্ক্ষিত সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয় না। এছাড়া, হাসপাতালে ডাক্তারদের তুলনায় নার্সদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কম থাকে এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ক্যারিয়ারে উচ্চপদে পদোন্নতি বা নেতৃত্বের সুযোগ সীমিত।
কারন যাই হোক না কেনও। এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ না নিয়ে দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার বড়সর প্রভাব পড়তে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞ মহলের। তাদের মতানুযায়ী,এই সংকট দূর করতে ভারতের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়ানো, নার্সদের বেতন কাঠামো উন্নত করা, গ্রামীণ স্তরে কাজের পরিবেশের মানোন্নয়ন এবং নার্সিং পেশার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।