SIR: সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন!

আইনত তিনি পোর্টাল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না!সীমা খান্নার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক কমিশনার সান্ধু

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে এই মুহূর্তে গোটা দেশ তোলপাড়। ভাবুন তো যে এসআইআর হওয়ার পর আপনি সারা সারা রাত জেগেছিলেন চিন্তায়। কিংবা ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়ার পর ফের তালিকায় নাম তুলতে গিয়ে আপনার সেই নাজেহাল অবস্থা কিংবা আতঙ্কে আপনার ঘরের মানুষের চলে যাওয়া।


ভোটারদের পিঠে চাবুকের মতো বসা এসআইআর নিয়েই উঠেছে বড় প্রশ্ন। প্রতিবেদনে প্রকাশ হওয়া তথ্য অনুসারে গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াতেই গলদ রয়েছে। তার মানে যাঁরা তালিকা থেকে বাদ গেছেন তাঁদের অধিকাংশই চক্রান্তের শিকার। এসআইআরের বিরুদ্ধে যে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে, জানেন কি সেই রিপোর্টে কী রয়েছে। এবার তাহলে ট্রাইবুনালে যাদের ভাগ্য ঝুলে রয়েছে তাঁদের কী হবে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে উঠেছে ভয়ঙ্কর অভিযোগ। নির্বাচন কমিশনের মতো স্বশাসিত সংস্থাকে নাকি তিনি ব্যবহার করেছেন। কার কথায় এভাবে এসআইআর নিয়ে একনায়কত্ব চালিয়েছেন জ্ঞানেশ কুমার তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশের পরই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট সামনে এসেছে। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশীর অভিযোগ, তাঁদের অন্ধকারে রেখে যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। যা একেবারেই নিয়মবিরুদ্ধ।

নির্বাচন কমিশনের নিয়মানুসারে ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করার জন্য ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সংবিধান-স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ। ভারতের রাষ্ট্রপতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে নিযুক্ত করেন। ১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দু’জন অতিরিক্ত নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই দুটি অতিরিক্ত পদ অবলুপ্ত করা হয়। অবশ্য ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর পুনরায় দুজন অতিরিক্ত নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত করা হয় এবং এই সংক্রান্ত আইনটি সংশোধনও করা হয়। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে তিন জন নির্বাচন কমিশনার বহাল রয়েছেন। সেইঅনুসারে নির্বাচন কমিশনের দ্বারা নেওয়া যে কোনও সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এক্ষেত্রে অভিযোগ জ্ঞানেশ কুমার তাঁর দুই সহযোগীকে আড়ালে রেখেই এসআইআর নিয়ে নানা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যেমন…..

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সান্ধু এবং জোশী। কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে এক দিনেই চার বার আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু কোনও বারেই তাঁদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেই ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে তাহলে তো গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াতেই গলদ রয়েছে। যেমন তাঁদের মূল অভিযোগ ফর্ম ৬ নিয়ে। এই ফর্ম ৬ ব্যবহার করে নতুন ভোটারেরা ভোটার তালিকায় নাম তোলার আর্জি জানান। এ বার সেই ফর্মে নতুন ভোটারদের জানাতে হয়েছে আগের এসআইআর-এ বাবা বা পিতামহের নাম রয়েছে কি না। সরকার এই সংক্রান্ত আইনে সংশোধন করার আগে ফর্ম বদলানো ঠিক হবে না বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন সান্ধু। কিন্তু সেই সতর্কতা কানে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এর প্রতিবেদন বলছে, গত ১৩ অগস্ট সান্ধু ফর্ম ৬-এর এই বদলকে অবৈধ বলেছিলেন। পিতা কিংবা পিতামহের সঙ্গে ওই ম্যাপিং সংক্রান্ত বিষয়টি দ্রুত সরিয়ে ফেলা উচিত বলেও মতপ্রকাশ করেন তিনি। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনে ফর্ম ৬ সংক্রান্ত কোনও নিয়মে বদল না এনেই নতুন ফর্ম প্রকাশ করা হয়েছিল।

এখানেই শেষ নয়, আগে ইআরওনেট সফ্‌টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ইসিআইনেট এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরওদের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। কারণ অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সান্ধু জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ইআরওনেট পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সান্ধু বলেন, আইন অনুযায়ী তিনি পোর্টালের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। অর্থাৎ যদি সোজা কথায় আপনাদের বলি বাক্স ইআরওদের কাছে থাকলেও তার চাবি দেওয়া হয়েছিল তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ওই আধিকারিককে। এই কারণেই নাকি গোয়ায় একাধিক ভোটার যোগ্য হয়েও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি।

গত ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, তথ্যগত অসঙ্গতি, মানে পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম বা বয়সের অমিল থাকা ভোটারদের নথি জমা দেওয়ার ও শোনার সুযোগ দিতে হবে। গোয়ার ইআরওরা তা শুনে ৯৭ জনকে যোগ্য বলে রায় দেন। কিন্তু সফ্‌টওয়্যারে সেই রায় লেখার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-র দফতর সে রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতীকে চারবার চিঠি লিখে, সীমা খন্নাকে সেই চিঠির কপি দিয়ে, রোলব্যাক অপশন চালু করতে বলে। যাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো বাদ দেওয়া নাম ফেরানো যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও উত্তর আসেনি, নথি জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়নি। ৯৭ জন যোগ্য ব্যক্তি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।

তার মানে বাংলাতেও যে এত নাম বাদ পড়ল সেখানেও কি এই গ্যাঁড়াকলের কারণে। পাশাপাশি বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশে ভোটার তালিকায় নাম উঠে যাওয়ার পরও নাম বাতিলের আবেদন জমা পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই সংখ্যাটা নয় নয় করে ১৬.১০ লক্ষ । এই আবেদন কারা করল, কমিশন তা খোলসা করেনি। বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা সম্মতি দেওয়ার পরেও কারা নাম বাদ দেওয়ার আর্জি জানাল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সান্ধু। এই সংক্রান্ত বিষয়ে সান্ধু কমিশনকে দেওয়া চিঠিতে জানান যে, এই বিষয়ে তিনি, জোশী এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক কিছুই জানতেন না। তাহলে কে জানতো, শুধু কি জ্ঞানেশ কুমার জানতেন।

কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিয়ম তো বলছে অন্য। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৪ অনুসারে, তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের গুরুত্ব অন্য দুজনের থেকে একটু বেশি। কিন্তু স্পষ্ট করে বলা আছে তিনি একক ভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। তিন জনের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ কমিশনার যা বলছেন, তা-ই চূড়ান্ত হবে। তাহলে এক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হল না কেন।

এই যদি হয় এসআইআরের আসল রূপ তাহলে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর পর ৩৮ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে ট্রাইবুনালের কাছে তাদের কি হবে । ২২.২১ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে বাদ পড়া নাম পুনরায় তোলার জন্য, তাঁদের কী হবে। এই প্রশ্নটাই এখন সবথেকে বড় হয়ে উঠেছে।