আজ রাজনীতির ইতিহাসের এমন এক ব্যক্তিত্বকে আপনাদের সামনে তুলে ধরব,যিনি স্বাধীন ভারতের সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম সাহসী, সৎ এবং আপসহীন রাজনীতিবিদ। তিনি গান্ধী পরিবারের এমন এক সদস্য যিনি নৈতিকতার পথে হাঁটতে গিয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন,দুর্নীতি ফাঁস করেছিলেন।ফিরোজ গান্ধী ।ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও, আজ তিনি অনেকটাই উপেক্ষিত এবং ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি নাম। কেবল দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী কিংবা নেহরু পরিবারের জামাতা হিসেবে নয়, বরং একজন প্রখর স্বাধীনচেতা ও সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর নিজস্ব একটি বলিষ্ঠ পরিচয় ছিল।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
ফিরোজ গান্ধীর জন্মসূত্রে নাম ছিল ফিরোজ জাহাঙ্গীর ঘ্যান্ডি। তিনি একটি পার্সি পরিবারের সন্তান ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার পর তিনি নিজের পদবির বানান পরিবর্তন করে ‘ঘ্যান্ডি’ থেকে ‘গান্ধী’ রাখেন। একাংশের মতে মহাত্মা গান্ধী তাকে স্নেহবশত বা রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে নিজের পুত্রতুল্য বা দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যার ফলে তিনি ‘গান্ধী’ পদবি ব্যবহার শুরু করেন। তবে রক্তের সূত্রে তারা একে অপরের আত্মীয় ছিলেন না।ফিরোজ গান্ধী এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁর শ্বশুর, স্ত্রী এবং পুত্র, সকলেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন৷ তবে তাঁর পরিচয় এতেই সীমাবদ্ধ নয়৷ মাত্র ৪৮ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর জীবন নানা আকর্ষণীয় ঘটনায় ভরা৷ পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে নেমে বারংবার জেলে গিয়েছেন আবার স্বাধীন ভারতে সংসদে তাঁর বক্তৃতা ঝড় তুলেছে৷ তাঁর সম্পর্কে গান্ধীজি বলেছিলেন, ‘ফিরোজের মতো সাতজনকে পেলে তিনি সাত দিনে দেশকে স্বাধীন করে দিতে পারেন৷’ ফিরোজের মৃত্যুর পর তাঁর শেষযাত্রায় ভিড় দেখে নেহরু মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি বুঝতে পারিনি ফিরোজ এত জনপ্রিয় ছিল৷’
লন্ডনে পড়াশোনার সময় ফিরোজের সঙ্গে ইন্দিরার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। প্রথম দিকে ১৬ বছর বয়সে ফিরোজের প্রস্তাব ইন্দিরা ফিরিয়ে দিলেও পরে তা মেনে নেন।এলাহাবাদের ‘আনন্দ ভবন’-এ হিন্দু মতে সাধারণ অনুষ্ঠানে তাঁদের বিয়ে হয়। ১৯৪২ সালের ২৬ মার্চ জওহরলাল নেহরুর তীব্র আপত্তি ও ভিন্ন ধর্মের কারণে প্রতিকূলতার মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ফিরোজ গান্ধীর বিবাহ হয়।মহাত্মা গান্ধীর হস্তক্ষেপে নেহরুর অমত সত্ত্বেও এই বিয়ে সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের দুই সন্তান রাজীব গান্ধী ও সঞ্জয় গান্ধীও রাজনীতির ময়দানে আসেন।তবে ইন্দিরার সাথে তার প্রেম বিবাহ হলেও রাজনৈতিক মতাদর্শের কারনে তাদের মধ্যে দুরত্ব বাড়তে থাকে। কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য এবং সাংসদ হওয়া সত্ত্বেও ফিরোজ গান্ধী সবসময় দলের ভুল নীতির বিরোধিতা করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ফিরোজ গান্ধী সবসময় সত্যের পক্ষে কথা বলেছেন। ১৯৫৯ সালে যখন ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন, তখন কেরালা সরকারকে বরখাস্ত করে সেখানে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফিরোজ গান্ধী এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং এক সকালে প্রাতরাশ টেবিলে জওহরলাল নেহরুর সামনেই ইন্দিরা গান্ধীকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

আজ যখন রাজনীতিতে সব দলের দুর্নীতির বড় উৎস স্বজনপোষণ, স্বাধীনতার ঠিক পরেই এই বিষয় সম্পর্কে অনেকটাই সতর্ক থাকতে চেয়েছিলেন ফিরোজ৷ অন্য কেউ হলে প্রধানমন্ত্রীর জামাই হওয়াটা উপভোগ করতেন কিন্তু ফিরোজ তেমন চরিত্রের লোক ছিলেন না।স্বাধীন ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম বড় কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছিলেন ফিরোজ গান্ধী। ১৯৫৮ সালে তিনি নেহরু সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হরিদাস মুন্ধ্রা নামের এক ব্যবসায়ীর করা মুন্ধ্রা কেলেঙ্কারি লোকসভায় উন্মোচন করেন। সরকারি মালিকানাধীন জীবন বীমা কর্পোরেশন কীভাবে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ব্যবসায়ী হরিদাস মুন্ধ্রার লোকসানি কোম্পানিতে জনগণের অর্থ বিনিয়োগ করেছিল, তা তিনি অকাট্য তথ্য-প্রমাণসহ সংসদে পেশ করেন। এই তদন্ত ও সাহসিকতার জেরে তৎকালীন নেহরু সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী টি. টি. কৃষ্ণমাচারিকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। নিজের শ্বশুর জওহরলাল নেহরুর সরকার হওয়া সত্ত্বেও তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে দ্বিধা করেননি।এর আগে, ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ফিরোজ গান্ধী রামকৃষ্ণ ডালমিয়ার মালিকানাধীন ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির আর্থিক জালিয়াতি জনসমক্ষে নিয়ে আসেন। তিনি প্রমাণ করেন কীভাবে ডালমিয়া তাঁর ব্যাংক ও বীমা কোম্পানির জনস্বার্থের অর্থ ব্যবহার করে টাইমস অব ইন্ডিয়ার মূল প্রকাশনা সংস্থা ‘বেনেট অ্যান্ড কোলম্যান’-এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে অর্থ পাচার করেছিলেন। এর ফলে ডালমিয়াকে পরবর্তীতে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়েছিল।
আজ আইনসভার ভিতরে জনপ্রতিনিধিরা কেমন আচরণ করছেন তা সাধারণ মানুষ দেখতে পান৷ কারণ সেখানে রয়েছে ক্যামেরা৷ একটা সময় সাংবাদিকদের অধিকার ছিল না সংসদের ভিতর কী হচ্ছে তা লেখার৷ স্বাধীনতা পরেও আইনসভার বিবরণী ছাপতে গিয়ে মানহানির অভিযোগের মুখোমুখি হতে হত সংবাদ মাধ্যমকে৷ সরকারের পক্ষ থেকে ফিরোজকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এমন একটি বিলের, যেটার লক্ষ্য হল আইনসভার বিবরণী ছাপার ব্যাপারে মানহানির অভিযোগ থেকে সংবাদমাধ্যমকে সুরক্ষিত রাখা। সংসদে দেওয়া বক্তব্যগুলো যাতে গণমাধ্যমে কোনো আইনি বাধা ছাড়াই হুবহু প্রকাশিত হতে পারে, সেজন্য তিনি একটি বিল পাস করিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে ‘ফিরোজ গান্ধী অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত।
১৯৬০ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ফিরোজ গান্ধীর অকালপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর মৃত্যুর পর ভারতের রাজনীতিতে নেহরু-গান্ধী বংশের ধারা ইন্দিরা গান্ধী এবং পরবর্তীতে তাঁর সন্তানদের হাত ধরে আবর্তিত হতে থাকে। রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পারিবারিক ইতিহাসের বিশাল আলোয় ফিরোজ গান্ধীর মতো একজন আপসহীন, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের অবদান আস্তে আস্তে ঢাকা পড়ে যায়।প্রশ্ন হচ্ছে ফিরোজ গান্ধীর এই নির্ভীক দৃষ্টিভঙ্গি, দুর্নীতিবিরোধী লড়াই এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার প্রয়াস কেনও গান্ধী পরিবারের বর্তমানে প্রজন্মের মুখে আলোচিত হয় না? তাদের ঠাকুরা জন্মসূত্রে পার্সি হওয়ায় ভোটব্যঙ্কে গ্রোহনযোগ্যতা কমার ভয় ? নাকি ফিরোজ গান্ধি বিস্মৃত হওয়ার পিছনে রয়ে অন্য কোনও কারন?