প্রয়াত নানা পাটেকর, শোকপ্রকাশ মোদীর

বৃহস্পতিবার সকালে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা নানা পাটেকরের। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। গোয়ার বাড়িতেই আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি। মণিপাল হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শেখর সালকার নানার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার যশোভূমিতে ‘ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেস’-এর দশম সংস্করণের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে নানার অভিনয়জীবনের কথা স্মরণ করেন তিনি। মোদীর কথায়, ‘‘তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী শিল্পী। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয় জয় করেছিলেন তিনি।’’

নানার অভিনয়ের বহুমুখী প্রতিভার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কোনও নির্দিষ্ট ধরনের চরিত্রের মধ্যে নিজেকে কখনও আটকে রাখেননি অভিনেতা। সিনেমার জগতে তিনি যেন মুক্ত পাখির মতো নিজের পথ তৈরি করে নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে সমাজের নানা অসঙ্গতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধেও নানার অভিনয় সরব ছিল বলে মন্তব্য করেন মোদী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘সিনেমার মাধ্যমে তিনি সমাজের অন্যায় ও ত্রুটিগুলির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নিজের মতো করে তিনি ছিলেন এক বিপ্লবী।’’ নানার কথার যেমন শক্তি ছিল, তেমনই তাঁর নীরবতারও গভীর প্রভাব ছিল বলে মন্তব্য করেন মোদী। অভিনেতার পরিবার, বন্ধু এবং অগণিত অনুরাগীর প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় নানার। মণিপাল হাসপাতালের চিকিৎসক শেখর সালকার জানান, বাড়িতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন অভিনেতা। প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দেওয়া হলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে পা রাখেন নানা। ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পন’-সহ একাধিক ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি ‘হাউসফুল ৫’, ‘ও’রোমিও’ এবং ‘সুবেদার’-এও অভিনয় করেছেন তিনি।

নানার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে রবি কিশন জানান, ‘প্রহার’ ছবির শুটিং চলাকালীন থেকেই তাঁদের বন্ধুত্বের সূত্রপাত। নানার সঙ্গে দেখা করতে তিনি মাঝেমধ্যেই শুটিংয়ের সেটে যেতেন। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়। ‘লাপাতা লেডিজ’ দেখার পরেও নানার সঙ্গে তাঁর ফোনে নিয়মিত কথা হত বলে জানিয়েছেন রবি।

গোয়ায় নানার বাড়িতে যাওয়ার স্মৃতিও ভোলেননি রবি। তাঁর কথায়, সেই বাড়িতেই এক বার গিয়ে দেখেছিলেন নানার অন্য রূপ—খ্যাতির আড়ালে একেবারে সাধারণ, আপনজনের মতো এক মানুষকে। রবি বলেন, ‘‘নিজের হাতে রান্না করে আমাকে খাইয়েছিলেন। নিজেই খাবার পরিবেশন করেছিলেন। এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়।’’
একটি ভিডিও বার্তায় মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, নানার মৃত্যু ভারতীয় সিনেমার পাশাপাশি সমাজেরও বড় ক্ষতি। ‘ক্রান্তিবীর’ থেকে ‘নটসম্রাট’—বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করার পাশাপাশি সমাজের নানা বিষয়ে সচেতন করেছেন নানা। নানার সমাজসেবামূলক কাজগুলিও তুলে ধরেন ফড়ণবীস । মহারাষ্ট্রে খরার সময় ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে ত্রাণ, জল সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন গ্রামে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। সীমান্তবর্তী এলাকায় এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গেও নানা কাজ করেছেন বলে জানান মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। ফড়ণবীস বলেন, ‘‘আমার কাছে তিনি ভাইয়ের মতো, পথপ্রদর্শকের মতো, বন্ধুর মতো ছিলেন।’’ তাঁর কথায়, ‘‘আজ আমরা এক দেশপ্রেমিক, সমাজকর্মী এবং অভিনেতাকে হারালাম।’’

দুঃখপ্রকাশ করোছেন অভিনেতা সানি দেওল। তিনি বলেন, নানা ছিলেন ভয়হীন এবং জীবনশক্তিতে ভরপুর একজন মানুষ। একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ না হলেও আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল খুব ভালো। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিনা যে নানা আর নেই। খুব মিস করবো। গদর-২ সিনেমার একটি ইভেন্টে নানার সঙ্গে তোলা একটি ছবিও শেয়ার করেছেন সানি দেওল।

নানা পাটেকরের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী। নানাকে নিজের ‘অত্যন্ত কাছের বন্ধু’ বলে উল্লেখ করে মিঠুন বলেন, ‘‘আমি গভীর ভাবে শোকাহত। ও বহু মানুষকে সাহায্য করত।’’

দুই অভিনেতার বন্ধুত্ব যে শুধু সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা-ও জানান মিঠুন। ১৯৮৮ সালে দুলাল গুহ পরিচালিত ‘সাগর সঙ্গম’ ছবিতে একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তাঁরা। সেটিই ছিল তাঁদের একমাত্র ছবি। ছবিতে মিঠুনের চরিত্র গোপিকে বড় করে তুলেছিলেন রামু উস্তাদ, যে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নানা।

নানা পাটেকরের হঠাৎ চলে যাওয়ার খবরে বিনোদন জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাদ যায়নি ক্রীড়াজগতও। শোকপ্রকাশ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন স্টার ব্যাটার বিরাট কোহলি এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার সুরেশ রায়না। কোহলি এক্স মাধ্যমে লিখেছেন, নানা ভারতীয় সিনেমার একজন সত্যিকারের লেজেন্ড। তাঁর কাজ আগামী প্রজন্মেও অমর হয়ে থাকবে। আপনার আত্মা শান্তি কামনা করি নানা পাটেকার জি। ওম শান্তি।

সুরেশ রায়না পোস্ট করেছেন, একজন সত্যিকারের লেজেন্ডের মৃত্যুতে একটা যুগের অবসান হল। নানা পাটেকর জি আপনার পারমফরম্যান্স, সততা এবং সরল মন আপনাকে চিরকাল অবিস্মরণীয় করে রাখবে।

নানা পাটেকরের অভিনয়জীবন শুরু ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে, ১৯৭৮ সালে। পরে ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘অঙ্গার’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পন’-এর মতো একাধিক ছবিতে অভিনয় করে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন তিনি। হিন্দি ও মারাঠি—দুই ইন্ডাস্ট্রিতেই তাঁর অভিনয়ের স্বতন্ত্র ছাপ ছিল। জীবনের শেষ পর্বেও অভিনয় চালিয়ে গিয়েছেন নানা। সম্প্রতি তাঁকে ‘হাউসফুল ৫’-এ দেখা গিয়েছিল। পাশাপাশি ‘ও’রোমিও’ এবং অনিল কাপুর-রাধিকা মদনের ‘সুবেদার’-এও অভিনয় করেছেন তিনি।

চিকিৎসক সালকার জানিয়েছেন, রাত আড়াইটে নাগাদ এক বন্ধুকে বার্তা পাঠিয়ে শরীর খারাপ লাগার কথা জানিয়েছিলেন নানা। ভোর ৪টে নাগাদ সেই বন্ধু তাঁর বাড়িতে পৌঁছন। তার কিছু পরেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে চলে গেলেন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা।